মাছ নেই, ঋণের জালে জেলেরা

প্রচ্ছদ » অর্থনীতি » মাছ নেই, ঋণের জালে জেলেরা
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬



---

খলিল উদ্দিন ফরিদ ॥

ভোর হওয়ার আগেই নদীর ঘাটে ছোটাছুটি শুরু করেন জেলেরা। কেউ ট্রলারে জাল তুলছেন, কেউ জ্বালানি নিচ্ছেন, আবার কেউ বরফ ও খাবার সংগ্রহ করছেন। সবার চোখে একটাই প্রত্যাশা নদী বা সাগর থেকে এবার বুঝি ভালো মাছ নিয়ে ফিরবেন। কিন্তু দিনের পর দিন সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। জাল ফেলেও মিলছে না কাঙ্খিত মাছ। অথচ মাছ ধরতে গিয়ে খরচ হচ্ছে জ্বালানি, শ্রমিকের মজুরি, খাবার ও বরফের টাকা। সঙ্গে আছে ট্রলার ও জাল কেনার ঋণের কিস্তি।

ফলে মাছের সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঋণের বোঝা। আয় কমে যাওয়ায় সংসারের খরচ মেটানোই যেখানে কঠিন, সেখানে নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চরফ্যাশনের হাজারো জেলে।

উপজেলার সামরাজ, ঢালচর, কচ্ছপিয়া, মুজিবনগর, নুরাবাদ, চর মাদ্রাজ, হাজারীগঞ্জ, জাহানপুর, চর মানিকা ও আহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার জেলেদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

জেলেরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও নদীতে একবার জাল ফেললে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত, এখন সেই মাছ পেতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক সময় সারা দিন-রাত নদী বা সাগরে অবস্থান করেও ট্রলারে ওঠে সামান্য মাছ। মাছ বিক্রির টাকা দিয়ে তখন জ্বালানি ও শ্রমিকের খরচই মেটানো যায় না। সংসারের খরচ তো দূরের কথা, ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

মাছের আশায় সাগরে, ফিরছেন লোকসান নিয়ে:

নুরাবাদ ইউনিয়নের জেলে আলাউদ্দিন বলেন, ‘এখন অনেক সময় সারা দিন-রাত জাল ফেলেও তেমন মাছ পাই না। আগে যে পরিমাণ মাছ পেতাম, এখন তার ধারে কাছেও পাওয়া যায় না। মাছ না থাকলে ঋণের কিস্তির টাকা কোথা থেকে দেব, এটাই এখন বড় চিন্তা।’

আলাউদ্দিনের মতো একই কথা অন্য জেলেদেরও। তাঁদের ভাষ্য, মাছ ধরতে বের হওয়ার আগেই তাঁদের খরচ নিশ্চিত। ট্রলারে জ্বালানি নিতে হয়, সঙ্গে নিতে হয় বরফ, খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। কয়েক দিন নদী-সাগরে অবস্থান করেও যদি পর্যাপ্ত মাছ না মেলে, তাহলে পুরো যাত্রাই লোকসানে পরিণত হয়।

একজন জেলে বলেন, ‘মাছ ধরতে গেলে আগে টাকা খরচ করতে হয়। মাছ পাওয়া যাবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু ঋণের কিস্তির তারিখ ঠিকই আসে।’

এক ঋণ শোধে আরেক ঋণ:

চরফ্যাশনের অনেক জেলে ট্রলার, জাল ও মাছ ধরার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনতে মহাজন, এনজিও ও স্থানীয় সমিতি থেকে ঋণ নিয়েছেন। মাছ ধরার মৌসুম ভালো গেলে সেই আয় থেকে কিস্তি পরিশোধের পাশাপাশি সংসারও চলে। কিন্তু মাছ কমে গেলে পুরো হিসাবই এলোমেলো হয়ে যায়।

তখন শুরু হয় ধারদেনা। কেউ মহাজনের কাছ থেকে নতুন করে টাকা নেন, কেউ এনজিও বা সমিতির ঋণ নেন। আবার কেউ পুরোনো ঋণের কিস্তি দিতে নতুন ঋণ করেন। এভাবে এক ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে আরেক ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে।

জেলেদের ভাষায়, ‘মাছের জালে যেমন মাছ আটকে যায়, তেমনি ঋণের জালেও আমরা আটকে যাচ্ছি।’

সামরাজ মৎস্য ঘাটের সভাপতি আজিজ পাটওয়ারী বলেন, ‘বর্তমানে নদী ও সাগরে মাছ কমেছে। এতে জেলেদের আয়ও কমেছে। তাঁরা সংসার চালাতে মহাজন ও সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন। মাছ কম থাকায় ঋণের কিস্তি পরিশোধে তাঁদের অনেক কষ্ট হচ্ছে।’

লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা মাছের ওপর:

চরফ্যাশন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় মৎস্য অঞ্চল। নদী ও সাগর ঘেঁষা এ উপজেলার বহু মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য আহরণের সঙ্গে যুক্ত।

উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে চরফ্যাশনে জেলের সংখ্যা লক্ষাধিক। এর মধ্যে সরকারি নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ৪৪ হাজার ৩১১ জন। সমুদ্রগামী জেলের সংখ্যা ১৭ হাজার ৫৬১ জন। এসব জেলের মাছ ধরার জন্য সমুদ্রগামী ট্রলার রয়েছে ১ হাজার ৩৬৫টি।

মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী, শ্রমিক, বরফকল, আড়তদারসহ আরও অনেক মানুষের জীবিকাও জেলেদের মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। ফলে নদী ও সাগরে মাছের প্রাপ্যতা কমে গেলে তার প্রভাব শুধু জেলে পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো মৎস্য অর্থনীতিতেই পড়ে।

নিষেধাজ্ঞা ও মাছের সংকটে চাপ বাড়ে:

জেলেদের আয় মৌসুমনির্ভর। বছরের বিভিন্ন সময়ে মাছ ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকে। এসব সময়ে জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তা দেওয়া হলেও তা দিয়ে পুরো পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন বলে জানান অনেকে।

মাছ ধরার মৌসুম শুরু হওয়ার পরও যদি নদী ও সাগরে পর্যাপ্ত মাছ না থাকে, তখন জেলেদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। কারণ নিষেধাজ্ঞার সময় আয় বন্ধ থাকার পর মাছ ধরার মৌসুমে তাঁরা সেই ঘাটতি পূরণের আশা করেন। কিন্তু মাছ কম পাওয়ায় সেই সুযোগও অনেকের মিলছে না।

সরকারি সহায়তা মিললেও কাটছে না অনিশ্চয়তা:

উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, সরকার প্রতিবছর জেলেদের জন্য ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দেয়। সেই বরাদ্দ থেকে জেলেদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘নদী ও সাগরে মাছ অনেকটাই কমেছে। জেলেরা তাঁদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না। ফলে অনেক জেলেই ঋণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।’

টেকসই সমাধান চান জেলেরা:

জেলেদের দাবি, শুধু খাদ্যসহায়তা দিয়ে তাঁদের সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাছের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়াতে নদী ও সাগরে অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ, মাছের অভয়াশ্রম সংরক্ষণ এবং প্রজনন মৌসুমে কার্যকর নজরদারি বাড়াতে হবে।

একই সঙ্গে মাছ না পাওয়ার সময়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধে নমনীয়তা, সহজ শর্তে সরকারি ঋণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

জেলেদের আশঙ্কা, মাছের সংকট দীর্ঘ হলে তাঁদের ঋণের পরিমাণ আরও বাড়বে। তখন অনেক পরিবারকে ট্রলার, জাল কিংবা অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করতে হতে পারে। কেউ কেউ বাধ্য হতে পারেন পেশা পরিবর্তনেও।

নদী-সাগরের ওপর নির্ভরশীল এই মানুষগুলোর কাছে তাই মাছ শুধু খাদ্য বা পণ্য নয়,এটাই তাঁদের জীবিকা, সংসার ও ভবিষ্যতের প্রধান অবলম্বন। সেই মাছের জোগান কমে গেলে শুধু জালই ফাঁকা থাকে না, ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে পড়ে জেলেদের ঘরের হাঁড়িও। আর সেই শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে তাঁরা জড়িয়ে পড়ছেন ঋণের আরও গভীর জালে।

বাংলাদেশ সময়: ২:১৩:০০   ১০৪ বার পঠিত  







পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

অর্থনীতি’র আরও খবর


গবেষণাগার থেকে শিল্প কারখানা, সংযোগ বাড়ানোর তাগিদ পবিপ্রবিতে
চরফ্যাশনে অসময়ে তরমুজ চাষে বাজিমাত, মিজানের নতুন সাফল্য
ভোলায় বজ্রপাতে ২টি মহিষের মৃত্যু
লালমোহনে বিশ্ব ডিম দিবস পালন
র‌্যালী ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে ভোলায় বিশ্ব দৃষ্টি দিবস পালিত
নিষেধাজ্ঞার আগে ভোলায় শত ট্রলার সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি
একদিকে ইলিশ সংকট, অন্যদিকে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা: দেনার দায়ে জর্জরিত ভোলার জেলেরা
সরকারি নিষেধাজ্ঞা, সংসার চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় জেলেরা
ভোলার গ্যাস বদলে দিতে পারে দেশের জ্বালানির ভবিষ্যৎ
লালমোহনে পোল্ট্রি শিল্পে নানা সংকট



আর্কাইভ