ফাইল আটকে ঘুষ দাবির অভিযোগ, শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রধান শিক্ষকদের নালিশ

প্রচ্ছদ » অপরাধ » ফাইল আটকে ঘুষ দাবির অভিযোগ, শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রধান শিক্ষকদের নালিশ
বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬



---

জি এম ছানাউল্লাহ।।

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ, চাঁদাবাজি, সরকারি বরাদ্দের অর্থে অনিয়ম এবং বিভিন্ন বিল-ফাইল আটকে অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এসব অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, একটি কথিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন অজুহাতে শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। দাবিকৃত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে আটকে রাখা হচ্ছে বিল ও ফাইলের কাজ।

শিক্ষকদের অভিযোগ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চরফ্যাশন উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আন্তঃইউনিয়ন ফুটবল টুর্নামেন্ট, প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতা, নির্বাচনী কেন্দ্র সংস্কার, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ডিভাইস, এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি, ক্ষুদ্র মেরামত ও প্রাক-প্রাথমিকসহ বিভিন্ন খাতে সরকারি বরাদ্দের অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম করা হয়েছে।

অভিযোগকারীরা জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চরফ্যাশনের ৪২টি ভোটকেন্দ্রের সংস্কারের জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে দেড় লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তাদের অভিযোগ, ওই বরাদ্দ থেকে প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৯ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের প্রায় চার মাস পর বরাদ্দের অর্থ ছাড় করা হলেও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ওই টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন প্রধান শিক্ষক।

এ ছাড়া আন্তঃইউনিয়ন ফুটবল টুর্নামেন্ট ও প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ইউনিয়ন পর্যায়ে যথাযথভাবে দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ডিভাইস কেনার জন্য বরাদ্দ ৯০ হাজার টাকা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা।

এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগ:

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চরফ্যাশনের ১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটিতে এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি খাতে ৩ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরবর্তী অর্থবছরে আরও আটটি বিদ্যালয়ে ৩ লাখ টাকা করে এবং একটি বিদ্যালয়ে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

শিক্ষকদের অভিযোগ, এসব বরাদ্দের বিপরীতে দৃশ্যমান কাজ না করেই অর্থের একটি অংশ ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় বিদ্যালয়কে বাদ দিয়ে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে বারবার বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।

অভিযোগে ১৮৬ নম্বর দক্ষিণ চর আইচা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়টি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি খাতে ৩ লাখ টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মেরামত ও সংস্কার খাতে ২ লাখ টাকা পায়। একই অর্থবছরে আবার এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি খাতে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পূর্ব নুরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ক্ষুদ্র মেরামত খাতে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি খাতে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফাইল আটকে রাখার অভিযোগ:

বিভিন্ন বিল ও সরকারি বরাদ্দের অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে ঘুষ দাবির অভিযোগও করেছেন কয়েকজন প্রধান শিক্ষক। তাদের দাবি, দাবিকৃত অর্থ না দিলে ফাইলে স্বাক্ষর করা হয় না।

হাজিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনির হোসেন অভিযোগ করেন, এরিয়ার বিলের জন্য উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তার কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। পরে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার বিল দেখে অফিসের ‘সাত্তারের’ কথা বলে আরও ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় বিলে স্বাক্ষর করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

মিয়াজানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নাছির উদ্দিনসহ কয়েকটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নির্বাচনী কেন্দ্র সংস্কারের বরাদ্দ থেকে টাকা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।

যা বলছেন প্রধান শিক্ষকরা:

মধ্য উত্তর মাদ্রাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাই খান বলেন, আন্তঃস্কুল ফুটবল টুর্নামেন্টে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের অধিকাংশ বরাদ্দ তারা পাননি।

মধ্য উত্তর ফ্যাশন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাই হাওলাদার বলেন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের তালিকা নেওয়া হলেও তারা কোনো ডিভাইস পাননি।

আসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনও ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের ফুটবল টুর্নামেন্টের বরাদ্দ না পাওয়ার কথা জানান।

এদিকে কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, প্রাক-প্রাথমিকের জন্য বিদ্যালয়প্রতি বরাদ্দ ৭ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে ওয়াই-ফাই সংযোগ না থাকা বা ইন্টারনেট সচল না থাকার পরও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের প্রত্যয়ন ছাড়াই একটি কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশে ১৮ লাখ ১৫ হাজার ২০০ টাকা উত্তোলনের অভিযোগও করেছেন তারা।

বিদ্যালয়ের কনটিনজেন্সি, বই পরিবহন, টিএ, বিভিন্ন দিবস পালন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯৬ শিক্ষকের বিনোদন ভাতার বিল ছাড়ের ক্ষেত্রেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

কর্মকর্তার বক্তব্য:

চরফ্যাশন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, অভিযোগগুলোর বিপক্ষে তার কাছে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের কথা জানান।

এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এই প্রথম আপনার কাছে তার বিষয়ে এত অভিযোগের কথা শুনলাম। আমার কাছে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আসেনি। যে দপ্তরে অভিযোগ করা হয়েছে, তারা অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে দেখবে। আমার কাছে অভিযোগ এলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগগুলো গুরুতর হওয়ায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হয়েছে কি না এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ দাবির অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সময়: ২৩:৫৮:৫৩   ১৬৩ বার পঠিত  







পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

অপরাধ’র আরও খবর


এনসিপিতে যুক্ত হয়ে শোকজের মুখে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা
ভোলায় মা ইলিশ রক্ষায় কঠোর প্রশাসন: ৮ জেলের কারাদন্ড, লাখ লাখ মিটার জাল জব্দ
মনপুরায় শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম
দৌলতখানে মটরসাইকেল, অস্ত্র, নগদ টাকাসহ রাজিব গ্রেফতার
রাজাপুরে সরঞ্জাম ও নগদ টাকাসহ ৫ জুয়াড়ি আটক
সরকারি চাকরিতে থেকেই এনসিপির কমিটিতে পদ!
ইলিশায় চুরি, মাদকের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর মানববন্ধন
ভোলায় ইলিশ নিষেধাজ্ঞার প্রথমদিনে আটক-৪, বিটুল পরিমান জাল জব্দ
বোরহানউদ্দিনে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, নীতিমালা অনুসরণের প্রশ্ন
লালমোহনে দলিল লেখকের মরদেহ উদ্ধার



আর্কাইভ