
আদিল হোসেন তপু ॥
ভোলায় জলাবদ্ধতার কারণে ব্যাহত হচ্ছে আমন ধানের আবাদ। সদর উপজেলার চর পাঙ্গাশিয়াসহ ২০টি বিলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পানি জমে থাকায় ৫০ হাজার কৃষকের ১৩ হাজার হেক্টর জমির আমন আবাদ হুমকির মুখে। কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে এমন দুর্ভোগে পড়তে হয় তাদের।
কৃষি বিভাগ বলছে, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা গেলে অনাবাদি জমিগুলো আবাদযোগ্য হবে। বাড়বে আমনের উৎপাদন। ভোলা সদর উপজেলার পশ্চিম ইলিশা ইউনিয়নের পাঙ্গাশিয়া গ্রামের কৃষক মহাসিন। চলতি বছর তিনি প্রায় ৬০ শতাংশ জমি দুই লাখ টাকা খরচ করে লিজ নিয়েছেন। স্বপ্ন ছিল, বছরজুড়ে আমনসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করে জমি লিজের খরচ তুলে লাভের মুখ দেখবেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জমিতে জলাবদ্ধতা থাকায় ব্যাহত হচ্ছে আমন ধানের আবাদ। সময়মতো চারা রোপণ করতে না পারায় এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে কৃষক মহাসিনের চোখে-মুখে এখন হতাশা আর দুশ্চিন্তার ছাপ।

কৃষক মহসিন জানান, এই জমতি আমি বছরে সোয়াবিন, আউস ও আমন ধান চাষ করি। পাশের জমিতে আমন ধান হাটু সমান হয়ে গেছে আমরা এখনও রোপণ করতে পারিনাই। সময় মতো রোপন করতে পারলে ধান থাকতো একমাঝা। এখন রোপন করা নিয়া চিন্তা করছি। এই জমি নিয়া আমাগো আর কোন আশা ভরসা নাই। কবে লাগামু কবে বড় হইবো। অনিশ্চয়তার মধ্যে আমরা কৃষকরা আছি। আমাদের খোঁজে খবর কেউ লয় না।
এটি ভোলা সদর উপজেলার পশ্চিম ইলিশা ইউনিয়নের চর পাঙ্গাশিয়া বিল। প্রতিবছর এ সময়ে কৃষকদের আমন ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত থাকার কথা। তবে এবার বিলজুড়ে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকায় জমিতে নামতে পারছেন না কৃষকরা।

এ বিলে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কৃষক চাষাবাদ করেন। অতিরিক্ত পানি জমে থাকায় প্রায় ৭০৩ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
কৃষকদের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে জলাবদ্ধতার সমস্যা থাকলেও এবার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। কৃষি জমির পাশে গ্যাস প্রসেস প্লান্ট তৈরি করার সময় পানি নিষ্কাশনের জন্য ছোট ডোবা বরাট করে ফেলায় কৃষি জমিতে পানি জমর থাকে।
পানি নিষ্কাশনের জন্য বার বার আবেদন জানিয়েও কার্যকর কোনো সমাধান পাননি তারা।
শুধু চর পাঙ্গাশিয়া বিল নয় একই চিত্র দক্ষিণ চরপাতা বিল, সুদুরচর বিল, বাপ্তা ইউনিয়নের চরপোটকা, চরনাপ্তা, দক্ষিণ চরনোয়াবাদ, ভেলুমিয়ার চরগাজী, শরীফখাঁ বাজার, ভেদুরিয়ার মিয়ার চর ও চরকালি বিলে অস্বাভাবিক পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। তবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা চর পাঙ্গাশিয়া বিলে।

এর ফলে কৃষিজমিই নয়, বিলসংলগ্ন অনেক বাড়ির উঠান, রাস্তা, সুপারিবাগান ও পুকুরও পানিতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, পানি চলাচলের প্রাকৃতিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি বিলে ঢুকলেও বের হতে পারছে না। ফলে সৃষ্টি হয়েছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা। দুর্ভোগে পড়েছে কৃষক।
চর পাঙ্গাশিয়া বিলের কৃষক মোকাম্মেল জানান, আষাঢ় মাসে প্রথমে আমরা জালা বুনতাম। কিন্তু জমি বৃষ্টির পানি জমে একবুক হয়ে যাওয়ার কারনে আমরা সময় মতো জালা রোপন করতে পারিনি। এখন ভাদ্র মাসও শেষ হয়ে যাচ্ছে। শুধু মাত্র বিলে পানির কারনে এবছর এই বিলে ফসল হবে কিনা সন্দেহ। আমাগো দুইটা মৌসুম মাইর গেছে। খুবই ক্ষতির মধ্যে আছি। যেদিক দিয়া পানির লাইন দিছে সেদিক দিয়া পানি না নামায় এমনটা হইছে বলে জানান।

বিলের পাশে বাড়ি গৃহিণী রাবেয়া বেগম জানান, আগে আমাগো ঘরের পাশ দিয়ে একটা ছোট নালার মতো ছিলো। সেদিক দিয়ে পাঙ্গাশিয়া সব পানি নামতো।এখন এখানে গ্যাস ফিল্ডের প্রসেস প্লান্ট তৈরি করায় সেই পানি নামার নালা বড়াট করে ফেলছে তাই পানি নামতে পারেনা। বর্ষাকালে আমাগো ঘরবাড়ি ডুইবা থাকে। ছোট ছোট পোলাইন নিয়ে পানির মধ্যে থাকতে খুব কষ্ট হয়। এখন যদি একটা পানি নামার ড্রেন কিংবা নালা টা পুনরায় চালু করে দেয় তাহলে আমাগো এই এলাকার কৃষক থেকে শুরু করে সবার উপকার হইতো।
এদিকে ভুক্তভোগী কৃষকেরা একাধিকবার প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কাছে পানিনিষ্কাশনের আবেদন জানিয়ে এবং মানববন্ধন করেও কার্যকর কোনো সমাধান পাননি।

কৃষি বিভাগ বলছে, অপরিকল্পিতভাবে খাল ভরাট, বসতবাড়ি ও রাস্তা নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে দ্রুত ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত ও পানি চলাচলের পথ উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাপেকসের গ্যাস ফিল্ডের প্রসেস প্লান্ট সার্ভেয়ার মেহেদী হাসান মির্জা জানান, আমাদের এই প্লান্টের পাশ দিয়ে ইতিমধ্যে একটি ড্রেন করে দেওয়া হয়ছে। শুষ্ক মৌসুমে আরো বড় করে ড্রেন করে দেয়ার জন্য ইতিমধ্যে বাপেক্স পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান।
ভোলা সদর উপজেলার কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো: কামরুল হাসান জানান, ভোলা সদর উপজেলার বড় বড় বিলের জমি অপরিকল্পিতভাবে ভরটা হয়ে যাওয়ার কারনে বর্ষাকলে কৃষি জমির জমে থাকা পানি নামতে পারছেনা। ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে আনমনা চাষাবাদে ব্যহত হচ্ছে।

তবে আমন চাষাবাদে কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। এতে ফলনে ঘাটতি হতে পারে। শুধু খাল খনন করে সমস্যার সমাধান হবে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক করা, পানি চলাচলের পথ উন্মুক্ত করা এবং প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সজল চন্দ্র শীল জানান, কৃষি জমিতে কিংবা এর আশপাশে অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মানে এমনি হচ্ছে। এতে করে কৃষকদের মারাত্মক ভাবে চাষাবাদ ব্যহত হচ্ছে।

আমরা এই সংক্রান্ত অনেকগুলো অভিযোগ পেয়েছি। সেগুলো যাচাই-বাছাই করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষি বিভাগ, বিএডিসি,স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে সমন্বয় করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
জলাবদ্ধতার কারণে ভোলা সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার কৃষকের ১৩ হাজার হেক্টর জমির আমন আবাদ হুমকির মুখে। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কৃষকেরা ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ছেন।
দ্রুত জলাবদ্ধতার সমাধান না হলে এবার আমন চাষ বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি ফলন কমে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন চর পাঙ্গাশিয়া বিল সহ উপজেলার হাজারো কৃষক।
বাংলাদেশ সময়: ২২:৫৮:১৬ ১৪২ বার পঠিত