লোকসানের অজুহাতে লঞ্চ চলাচল বন্ধ: একসময়ের জমজমাট ‘ভোলা খেয়াঘাট’ এখন নিরব-নিস্তব্ধ

প্রচ্ছদ » অর্থনীতি » লোকসানের অজুহাতে লঞ্চ চলাচল বন্ধ: একসময়ের জমজমাট ‘ভোলা খেয়াঘাট’ এখন নিরব-নিস্তব্ধ
রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬



---

শিমুল চৌধুরী ॥

ভোলা খেয়াঘাট। জেলা শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের এই ঘাট থেকে একসময় ভোলা-ঢাকাগামী যাত্রীবাহী ৮টি লঞ্চ নিয়মিত চলাচল করত। সেসময় সবার কাছে ভোলা খেয়াঘাটটির একটা পরিচয় ছিল, এ নামেই স্থানটিকে ডাকা হয়েছে। এখনো স্থানটির নাম সেই একই আছে। শুধু নেই খেয়াঘাটজুড়ে কোন লঞ্চ, নেই লঞ্চ আসা-যাওয়ার হাঁকডাক, হইচই, ছোটাছুটি। সময়ের সঙ্গে স্থানটি তার পুরোনো চেহারা অনেকটাই হারিয়েছে।

বর্তমানে সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নের ইলিশা লঞ্চঘাট থেকে ভোলা-ঢাকাগামী যাত্রীবাহী লঞ্চগুলো চলাচল করছে। যার কারণে অনেকটা যাত্রী সংকট দেখা দেয় ভোলা খেয়াঘাটে। ফলে এখন যেন ইতিহাসের একটুকরো অংশ হয়ে আছে ভোলা খেয়াঘাট। এ অবস্থায় এই ঘাটটি ইজারা নিয়েও বিপাকে পড়েছেন ইজারাদার।

অন্যদিকে-যাত্রী সংকট, লোকসানের অজুহাত, ইজারাদার ও তার লোকজনদের অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে এই রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে বলে দাবি লঞ্চ কর্তৃপক্ষের।

সরেজমিনে ভোলা খেয়াঘাট ঘুরে দেখা গেছে, স্থানটিতে এখন আর একটিও ভোলা-ঢাকাগামী যাত্রীবাহী লঞ্চ নোঙর করা নেই। টার্মিনালে যেন সুনসান নীরবতা। নেই আগের মতো ঘাট শ্রমিকদের হাঁকডাক। একেবারেই নিরব-নিস্তব্ধ। সেখানে মানুষের জমজমাট পদচারণা না থাকলেও বেশ কয়েকটি ছাগলকে দেখা গেছে হাঁটাচলা করতে। টার্মিনালে মানুষের অনুপস্থিতির সূযোগে সেখানে ছাগল চড়ানো হচ্ছে।

অথচ এই ঘাট দিয়েই একসময়ে সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভেঁপু বাজিয়ে ঢাকা সদর ঘাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে লঞ্চ, আবার ভোরে ফিরে এসে ঘাটে নোঙর করেছে; ভোলা খেয়াঘাটটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে জেলা পরিষদ মার্কেটের দোকানসহ বহু ব্যবসায়ী দোকান। কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে কয়েক শো শ্রমিকের। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল সিএনজি, অটো রিকশা, ভ্যানগাড়ি, ঠেলাগাড়ি, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, মালবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন। এখন সে রকম কোন দৃশ্য আর চোখে পড়ছে না। নীরব আর নিস্তব্ধ হয়ে গেছে একসময়ের জমজমাট থাকা ভোলা খেয়াঘাটটি।

বিআইডব্লিউটিএ, ঘাট ইজারাদার, ঘাট শ্রমিক, শ্রমজীবী মানুষসহ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বৃটিশ আমল থেকেই ভোলা সদর উপজেলার চরসামাইয়া ইউনিয়নের ১নম্বর ওয়ার্ডের চরশিফলী গ্রামে তেতুলিয়া নদী সংলগ্ন খাল পাড়ে গড়ে ওঠে ভোলা খেয়াঘাট। ২০০৪ সালে ‘ভোলা খেয়াঘাট’ জেলার প্রথম ও একমাত্র লেবার হ্যান্ডেলিং পয়েন্ট হিসাবে ঘোষণা করে বিআইডব্লিউটিএ।

এই ঘাট থেকেই যাত্রীবাহী ৮টি লঞ্চে জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাজার হাজার যাত্রী প্রতিদিন ঢাকা যাতায়াত করেছে। এছাড়া পণ্যবাহী কার্গো, দূরদেশের ছোট-বড় জাহাজ, ট্রলার ও নৌকা এসে ভিড়েছে এই ভোলা খেয়াঘাটে। এ ঘাটটি-ই ছিল পুরো জেলার একমাত্র লঞ্চঘাট। সেই থেকে এই এলাকায় গড়ে ওঠে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, ভোলা নদী বন্দরসহ কিছু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

এই খেয়াঘাট ঘিরে সেখানে চায়ের স্টল, খাবারের দোকান, ওষুধের ফার্মেসি, মুদি দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এই ঘাটেই বিভিন্ন স্থান থেকে মাছ নিয়ে আসত মৎস্য ব্যবসায়ীরাও। সেই মাছ হাঁকডাক করে বেচাকেনা হতো। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত স্থানটি মুখর ছিল। তবে গত ৫ জুলাই থেকে ভোলা-ঢাকাগামী লঞ্চ চলাচল বন্ধ হওয়ার পর নিস্তব্ধতা নেমে আসে ভোলা খেয়াঘাটে। একসময়ের সরগরম ভাব কোথায় যেন হারিয়ে গেছে! স্থানটি এখন নিঃশব্দ-নীরবে কালের গর্ভে আরও অনেক কিছুর মতো হারিয়ে যাওয়ার পথে।

কথা হয় ভোলা খেয়াঘাট-সংলগ্ন হোটেল ব্যবসায়ী মোশারেফ হোসেনের সাথে। সদর উপজেলার চরসামাইয়া ইউনিয়নের চরশিফলী গ্রামের চৌকিদার বাড়ির অর্ধশত বছর বয়সী এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আজকের পত্রিকাকে বলেন, সেই ছোটবেলা থেকেই ঘাটটি দেখে বড় হয়েছি আমরা। এখানেই দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে হোটেল ব্যবসা করেছি। আমার বাবা আব্দুর রশিদও এই ব্যবসা করতেন। রাত-দিন সব সময় মানুষে জমজমাট থাকত এই খেয়াঘাটে। পান-সিগারেট, আচার-চানাচুর, মৌসুমি ফল বিক্রেতার চেঁচামেচি থাকত। ঘাটকেন্দ্রিক হোটেলসহ নানা ধরনের দোকান ছিল। তিনি আরও বলেন, আগে যখন লঞ্চ চলত, তখন আমার প্রতিদিনের আয় ছিল ৩-৪ হাজার টাকা। এখন লঞ্চ চলাচল না করায় কোন আয়ও নেই। স্ত্রী, ৪ ছেলে ও ২ মেয়ে নিয়ে ধারদেনা করে অনেক কষ্টে চলছে আমাদের সংসার। মোশারেফ বলেন, ঘাটের অনেক ব্যবসায়ী অন্যত্র চলে গেছেন। এখন নামমাত্র কিছু দোকান আছে। আগের কিছুই নেই।

খেয়াঘাটের চায়ের দোকানী আব্দুল্লাহ (৭৫) বলেন, দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে ঘাটে শ্রমিকের কাজ করেছি। এখন চায়ের দোকান করছি। বর্তমানে লঞ্চ নাই, তাই কোন আয়ও নাই।

---

চা-স্টল মনির স্টরের মালিক মো. মনির বলেন, ‘যখন ঘাটে লঞ্চ চলাচল ছিল, তখন বেচাকিনা ভালো ছিল। তখন অনেকে বাকিও খেত। তবুও অতিরিক্ত মানুষের যাতায়াতের কারণে সেই ক্ষতি পোষানো যেত। কিন্তু বর্তমানে লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় লোকসানে আছি।এখন দুপুরের পর নীরব হয়ে যায়।

ঘাট শ্রমিক মো. জসিম বলেন, ভোলা খেয়াঘাটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় এখানকার শতাধিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ী কাজের সন্ধানে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছেন। তিনি আরও বলেন, লঞ্চ বন্ধ থাকায় এখানকার হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ বেকার হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে ভোলা খেয়াঘাট লেবার হ্যান্ডেলিং এর ইজারাদার মো. জাহাঙ্গীর আলম ও তার ভাই খোকন বলেন, আমরা চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে আগামী বছরের ৩০ জুলাই পর্যন্ত এক বছরের জন্য ৫২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা দিয়ে ইজারা নিয়েছি। ঘাট ইজারা নেওয়ার পর এই ঘাট থেকে মাত্র ৫ দিন ভোলা-ঢাকা রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ আবে জমজম-৩ ও এমভি কর্নফুলী-৯ চলাচল করছিল। কিন্তু বর্ষার অজুহাতে লঞ্চ দুটি চলাচল বন্ধ করে দেয়। এরপর আজ-কাল করতে করতে এ রুটে আর লঞ্চ চলাচল করেনি। এতে আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। ফলে বাধ্য হয়ে ইজারার টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য গত ১৭ জুলাই বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান বরাবর একটি আবেদনও করেছি। ব্যংক থেকে ঋণ নিয়ে ইজারার টাকা দিলেও এখন পর্যন্ত সেই টাকা ফেরত পাননি বলেও জানান ইজারাদার জাহাঙ্গীর আলম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ ভোলা নদী বন্দরের সহকারী পরিচালক নির্মল কুমার রায় বলেন, খেয়াঘাট থেকে ভোলা-ঢাকা রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী লঞ্চ আবে জমজম-৩ ও এমভি কর্ণফুলী-৯ দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত চলাচল করলেও যাত্রী সংকট ও লোকসানের অজুহাতে হঠাৎ তাদের লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়। এতে নদী বন্দরসহ ঘাটে একরকম অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। বেকার হয়ে পড়ে হাজারো শ্রমিক। ফলে বাধ্য হয়ে ইজারার টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান বরাবর একটি আবেদনও করেছেন ইজারাদার। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলেও জানান বিআইডব্লিউটিএ ভোলা নদী বন্দরের সহকারী এ কর্মকর্তা।

এদিকে ভোলা-ঢাকা রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলো বন্ধ রেখে লঞ্চ মালিক ভোলার ইলিশা থেকে ঢাকা রুটে চলাচলের জন্য রুট পারমিট চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন বলে বিআইডব্লিউটিএ সূত্র থেকে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কর্নফুলী-৯ লঞ্চ ভোলা অফিসের ব্যবস্থাপক মো. আলাউদ্দিন বলেন, এখন প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভোলার ইলিশা লঞ্চঘাট থেকেই সব লঞ্চ ঢাকা চলাচল করছে। এতে সময়ও কম লাগছে। ফলে ওই রুটেই যাতায়াত করছে বেশিরভাগ যাত্রী। তাঁরা ভোলা খেয়াঘাট থেকে ঢাকা যাতায়াত করতে চাইছে না। যাত্রী সংকটের কারণে আমাদের লোকসান হচ্ছে। তাই, আপাততঃ ভোলা খেয়াঘাট থেকে ঢাকা আমাদের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে। তবে, ভোলার ইলিশা থেকে ঢাকা রুটে চলাচলের জন্য রুট পারমিট চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে কিনা তা জানা নেই কর্নফুলী লঞ্চ ভোলার দায়িত্বপ্রাপ্ত এ কর্মকর্তার।

স্থনীয়দের আশা-বিআইডব্লিউটিএ’র হস্তক্ষেপে ভোলা খেয়াঘাটে আবারও লঞ্চ চলাচল করবে এবং ঘাটটিকে ঘিরে ফের জমজমাট হয়ে উঠবে। এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।

বাংলাদেশ সময়: ১২:৩৯:৩১   ১৪৩ বার পঠিত  







পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

অর্থনীতি’র আরও খবর


গবেষণাগার থেকে শিল্প কারখানা, সংযোগ বাড়ানোর তাগিদ পবিপ্রবিতে
চরফ্যাশনে অসময়ে তরমুজ চাষে বাজিমাত, মিজানের নতুন সাফল্য
ভোলায় বজ্রপাতে ২টি মহিষের মৃত্যু
লালমোহনে বিশ্ব ডিম দিবস পালন
র‌্যালী ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে ভোলায় বিশ্ব দৃষ্টি দিবস পালিত
নিষেধাজ্ঞার আগে ভোলায় শত ট্রলার সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি
একদিকে ইলিশ সংকট, অন্যদিকে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা: দেনার দায়ে জর্জরিত ভোলার জেলেরা
সরকারি নিষেধাজ্ঞা, সংসার চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় জেলেরা
ভোলার গ্যাস বদলে দিতে পারে দেশের জ্বালানির ভবিষ্যৎ
লালমোহনে পোল্ট্রি শিল্পে নানা সংকট



আর্কাইভ