
।। এ এইচ এম বজলুর রহমান ।।
সিনেমা হলের অন্ধকার ঘরে একসময় মানুষ একসঙ্গে বসে আলো দেখত। সেই আলো শুধু পর্দার ছিল না; ছিল সমাজেরও। একটি জনপদের মানুষ যখন একই পর্দার সামনে বসে হাসে, কাঁদে, বিস্মিত হয়, স্বপ্ন দেখে, তখন চলচ্চিত্র আর কেবল বিনোদন থাকে না। তা হয়ে ওঠে সামাজিক স্মৃতি, সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা এবং মানুষের সম্মিলিত কল্পনার এক শক্তিশালী মাধ্যম।
ভোলা দ্বীপের সিনেমা হলগুলোর স্মৃতি তাই শুধু কয়েকটি পুরোনো ভবনের ইতিহাস নয়। এটি এক সময়ের মানুষের আনন্দ, অপেক্ষা, আড্ডা, পরিবার নিয়ে বাইরে বের হওয়া, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সিনেমা দেখা এবং মফস্বল জীবনের সাংস্কৃতিক উচ্ছ্বাসের ইতিহাস। লালমোহন, ভোলা ও বরিশালের সিনেমা হলে বসে আমরা দেখেছি বন্ধু আমার সুরুজ মিয়া, পিচঢালা রাজপথ, কেয়ামত থেকে কেয়ামত, পদ্মা নদীর মাঝি, শ্রাবণ মেঘের দিন, কমলার বনবাস, বেদের মেয়ে জোসনা, আগুনের পরশমণি, পৃথিবী তোমার আমার, মিস ডায়নাসহ অসংখ্য চলচ্চিত্র। এসব সিনেমা কেবল গল্প দেখায়নি; আমাদের সময়, সমাজ, প্রেম, সংগ্রাম, হাসি-কান্না ও স্বপ্নকে বড় পর্দায় দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল।
চলচ্চিত্র আমাদের জাতীয় স¤পদ। এটি শিল্পকলার শক্তিশালী মাধ্যম, আবার শিক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। একটি ভালো চলচ্চিত্র মানুষের চিন্তা বদলাতে পারে, ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করাতে পারে, সমাজের অদেখা বাস্তবতাকে সামনে আনতে পারে। কিন্তু যে প্রেক্ষাগৃহে মানুষ সেই চলচ্চিত্র দেখবে, সেই জায়গাগুলোই যদি হারিয়ে যায়, তাহলে চলচ্চিত্র ধীরে ধীরে শহুরে মধ্যবিত্তের সীমিত ভোগ্যপণ্য হয়ে ওঠে। তখন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মফস্বল ও উপকূলীয় জনপদের মানুষ, সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা থেকে দূরে সরে যায়।
কোস্টাল ভোলা পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় একসময় ২৫টির মতো সিনেমা হল ছিল। আজ সেগুলোর প্রায় সবই বন্ধ। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ভোলা সদরের রূপসী সিনেমা হল কোনোভাবে টিকে আছে, কিন্তু সেখানেও কাক্সিক্ষত দর্শক নেই। যে ভোলা দ্বীপে একসময় সিনেমা হল ছিল মানুষের বিনোদন, সংস্কৃতি ও সামাজিক মিলনের অন্যতম জায়গা, সেখানে এখন হলের নীরবতা এক ধরনের সাংস্কৃতিক শূন্যতার কথা বলে।
এই সংকট কেবল ভোলার নয়; এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র প্রদর্শন ব্যবস্থার সামগ্রিক সংকটের অংশ। নব্বইয়ের দশকে সারা দেশে এক হাজারের বেশি সিনেমা হল সচল ছিল। জেলা শহর, উপজেলা সদর, এমনকি অনেক বড় বাজারকেন্দ্রেও সিনেমা হল ছিল। কিন্তু গত দুই দশকে একের পর এক হল বন্ধ হয়েছে। কোথাও হল ভেঙে মার্কেট হয়েছে, কোথাও গুদাম, কোথাও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কোথাও বহুতল ভবন। যে জায়গায় একসময় পর্দায় আলো জ্বলত, সেখানে এখন বাণিজ্যিক স্থাপনা দাঁড়িয়ে আছে। উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু সাংস্কৃতিক পরিসর কি বড় হয়েছে? এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
কেন একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেল? এর উত্তর একক নয়। প্রথমত, দর্শক কমেছে। একসময় সিনেমা দেখার জন্য হলে যাওয়া ছাড়া বড় কোনো বিকল্প ছিল না। এখন মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, ইউটিউব, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের বিনোদনের ধরন বদলে দিয়েছে। মানুষ ঘরে বসেই সিনেমা, নাটক ও নানা ধরনের ভিডিও দেখতে পারে। ফলে হলমুখী দর্শক কমেছে।
তবে এটিই পুরো সত্য নয়। দর্শক কমেছে, কিন্তু দর্শকের চাহিদা শেষ হয়ে যায়নি। ভালো সিনেমা, ভালো পরিবেশ, নিরাপদ প্রেক্ষাগৃহ এবং সুলভ টিকিট থাকলে মানুষ এখনো হলে যায়। দুই ঈদে বড় বাজেটের কিছু সিনেমা মুক্তি পেলে দর্শকের ভিড় দেখা যায়। কিন্তু সারা বছর যদি মানসম্মত সিনেমা না থাকে, একটি হল কেবল ঈদকেন্দ্রিক ব্যবসায় টিকে থাকতে পারে না। বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীর বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ, ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সারা বছরই থাকে। আয় যদি অনিয়মিত হয়, তাহলে হলমালিকেরা শেষ পর্যন্ত ভবন ভেঙে অন্য ব্যবসায় যেতে বাধ্য হন।
আরেকটি বড় কারণ হলো প্রেক্ষাগৃহের অবকাঠামোগত দুর্বলতা। অনেক পুরোনো সিঙ্গেল স্ক্রিন হল সময়ের সঙ্গে বদলায়নি। আসন, শব্দব্যবস্থা, পর্দা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, নারী ও পরিবারের জন্য উপযোগী পরিবেশ, এসব বিষয়ে ঘাটতি ছিল। নতুন প্রজন্ম ভালো ছবি দেখতে চায়, কিন্তু তার সঙ্গে ভালো পরিবেশও চায়। পরিবার নিয়ে সিনেমা হলে যাওয়ার মতো সম্মানজনক ও নিরাপদ পরিবেশ না থাকলে দর্শক ফিরবে না।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চলচ্চিত্র পরিবেশনা ব্যবস্থাও দুর্বল। ভালো সিনেমা সব সময় মফস্বলের হলে পৌঁছায় না। ডিজিটাল প্রজেকশন, ই-টিকিটিং, পাইরেসি প্রতিরোধ, স্থানীয় প্রচারণা এবং নিয়মিত প্রদর্শনের অভাবে অনেক হল প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি। ঢাকার সিনেপ্লেক্সে যে সিনেমা দর্শক টানে, সেই সিনেমা যদি ভোলা, লালমোহন বা অন্য উপকূলীয় অঞ্চলের দর্শকের কাছে সময়মতো না পৌঁছায়, তাহলে সেখানকার মানুষকে হলবিমুখ বলে দায়ী করা সহজ, কিন্তু তা ন্যায্য নয়।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: সাধারণ মানুষ সিনেমা দেখবে কোথায়?
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আছে, কিন্তু সবার হাতে স্মার্ট টিভি নেই, সবার ঘরে স্থিতিশীল ইন্টারনেট নেই, সবার পক্ষে সাবস্ক্রিপশন নেওয়াও সহজ নয়। মোবাইলে সিনেমা দেখা যায়, কিন্তু তা কখনোই প্রেক্ষাগৃহের সামাজিক অভিজ্ঞতার বিকল্প নয়। বড় পর্দা, একসঙ্গে বসে দেখা, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, একটি জনপদের মানুষকে একই সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার ভেতর আনা, এসবের আলাদা মূল্য আছে। সাংস্কৃতিক অধিকারকে যদি আমরা গুরুত্ব দিই, তাহলে প্রেক্ষাগৃহকে শুধু ব্যবসা হিসেবে নয়, জনসাধারণের সাংস্কৃতিক অবকাঠামো হিসেবেও ভাবতে হবে।
ভোলার মতো দ্বীপ জেলায় সিনেমা হল ছিল মানুষের বিনোদনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগের জায়গা। কৃষক, জেলে, শ্রমজীবী মানুষ, ছাত্র, তরুণ, দোকানদার, চাকরিজীবী, পরিবার, সবাই কোনো না কোনোভাবে এই পরিসরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সিনেমা হলের আশপাশে চায়ের দোকান, পোস্টারশিল্পী, টিকিট বিক্রেতা, পরিবেশক, কর্মচারী, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অনেকের জীবিকা জড়িয়ে থাকত। একটি হল বন্ধ হলে শুধু একটি ভবনের দরজা বন্ধ হয় না; বন্ধ হয় একটি ছোট অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চক্র।
তাই ভোলার সিনেমা হল ফিরিয়ে আনার প্রশ্নটি শুধু নস্টালজিয়ার নয়; এটি সাংস্কৃতিক ন্যায্যতার প্রশ্ন। পুরোপুরি পুরোনো দিনে ফিরে যাওয়া হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু নতুনভাবে শুরু করা সম্ভব। জেলা পর্যায়ে ছোট আকারের আধুনিক মিনি সিনেপ্লেক্স হতে পারে। পুরোনো হলগুলো সংস্কার করে ডিজিটাল প্রদর্শন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা, বেসরকারি উদ্যোক্তা ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, তরুণ চলচ্চিত্রপ্রেমী এবং শিশু-কিশোরদের লক্ষ্য করে নিয়মিত প্রদর্শনীর আয়োজন করা যেতে পারে।
ভোলা দ্বীপের নিজস্ব গল্পও চলচ্চিত্রের জন্য শক্তিশালী উপাদান। নদীভাঙন, চরজীবন, মেঘনা-তেঁতুলিয়ার মানুষ, জেলে, কৃষক, নারীর সংগ্রাম, উপকূলীয় দুর্যোগ, অভিবাসন, স্থানীয় রাজনীতি ও লোকসংস্কৃতি, সবই বড় পর্দার গল্প হতে পারে। শুধু ঢাকার ছবি ভোলায় দেখানো নয়; ভোলার গল্পও একদিন ভোলার পর্দায় দেখা দরকার।
রূপসী সিনেমা হলের টিকে থাকা তাই একটি প্রতীক। এটি শুধু একটি প্রেক্ষাগৃহ নয়; এটি ভোলার হারিয়ে যাওয়া চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির শেষ আলো। এই আলো নিভে গেলে ভোলার মানুষ আরেকটি সামাজিক স্মৃতি হারাবে।
সিনেমা হলের অন্ধকার ঘরে মানুষ একসময় আলো দেখত। সেই আলো ছিল পর্দার, আবার ছিল সমাজেরও। ভোলার বন্ধ হয়ে যাওয়া ২৫টি সিনেমা হল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংস্কৃতির অবকাঠামো হারালে একটি জনপদ ধীরে ধীরে তার সম্মিলিত আনন্দও হারায়। এখন সময় এসেছে সেই হারানো আলো নিয়ে নতুন করে ভাবার।
লেখক: এ এইচ এম বজলুর রহমান
ডিজিটাল গণতন্ত্র, তথ্যের অখ-তা ও গণমাধ্যম উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ক অ্যাম্বাসাডর
বাংলাদেশ সময়: ২:০৮:৩৯ ২৫১ বার পঠিত