
।। এ. এইচ. এম. বজলুর রহমান ।।
ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরা বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদের এক অনন্য ভূগোল। নদী, মেঘনা, চর, জোয়ার-ভাটা, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, মৎস্যজীবী জীবন, কৃষি, প্রান্তিক মানুষের সংগ্রাম, সব মিলিয়ে মনপুরা শুধু একটি উপজেলা নয়; এটি দ্বীপবাংলার এক জীবন্ত বাস্তবতা। দীর্ঘদিন ধরে এই দ্বীপের মানুষের বড় সংকটগুলোর একটি ছিল স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধার অভাব। বিদ্যুৎ ছাড়া আধুনিক জীবন কল্পনা করা যায় না, কিন্তু দ্বীপবাসীর জন্য বিদ্যুৎ এখনো অনেক সময় প্রত্যাশা, অপেক্ষা ও সীমাবদ্ধতার নাম।
এই বাস্তবতায় পশ্চিম অঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কো¤পানি লিমিটেড বা WZPDCL-এর উদ্যোগে মনপুরা দ্বীপপুঞ্জে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। শক্তি, বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদ্যুৎ বিভাগ এবং WZPDCL-এর “মনপুরা দ্বীপপুঞ্জে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ” প্রকল্পের আওতায় সাবমেরিন কেবল ও ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপনের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এটি শুধু একটি কারিগরি প্রকল্প নয়; এটি মনপুরার মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, টার্নকি ভিত্তিতে ৩৩ কেভি সাবমেরিন কেবলের নকশা, সরবরাহ, স্থাপন, পরীক্ষণ ও কমিশনিংসহ সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চারটি রানসহ মোট ২৮ কিলোমিটার ১সি ৩০০ বর্গমিলিমিটার সাবমেরিন কেবল স্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মাণও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই কারিগরি কাঠামো দেখায়, প্রকল্পটি ছোটখাটো অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়; বরং মনপুরাকে মূল বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে আরও স্থিতিশীলভাবে যুক্ত করার একটি পরিকল্পিত উদ্যোগ।
দরপত্রটি “ওয়ান স্টেজ টু এনভেলপ টেন্ডারিং মেথড” পদ্ধতিতে আহ্বান করা হয়েছে। প্রকল্পের অর্থায়ন হবে WZPDCL-এর নিজস্ব তহবিল থেকে। আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঠিকাদার নির্বাচনের শর্তও গুরুত্বপূর্ণ। গত ১০ বছরের মধ্যে অন্তত দুটি অনুরূপ প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা, ৩৩ কেভি বা তার বেশি ক্ষমতার সাবমেরিন কেবল স্থাপন, পরীক্ষণ ও চালুকরণের দক্ষতা, এবং বাংলাদেশের অনুরূপ ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলে বিদেশে অন্তত একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা, এসব শর্ত প্রকল্পের মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক।
সাবমেরিন কেবল স্থাপন কোনো সাধারণ কাজ নয়। নদী বা সাগরতলের ভূপ্রকৃতি, স্রোত, পলি, নৌযান চলাচল, ঘূর্ণিঝড়, জোয়ার-ভাটা, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ, সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়। তাই দরদাতাদের ব্যবহৃত জাহাজের মডেল, ধরন ও সক্ষমতার প্রমাণপত্র চাওয়া যথার্থ। মনপুরার মতো দ্বীপ অঞ্চলে কেবল স্থাপন মানে শুধু তার নামানো নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব এবং নির্ভরযোগ্যতার প্রশ্ন।
মনপুরায় এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রথম যে পরিবর্তনটি দৃশ্যমান হবে, তা হলো বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা। বর্তমানে দ্বীপাঞ্চলের মানুষের জন্য বিদ্যুৎ অনেক সময় অনিয়মিত, সীমিত বা ব্যয়বহুল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পেলে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, বাজার, স্কুল, মাদ্রাসা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রশাসনিক দপ্তর, ব্যাংকিং সেবা, ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা নতুন গতি পাবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা খাতে এর বড় প্রভাব পড়বে। বিদ্যুৎ না থাকলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা সীমিত হয়ে যায়। রাতে পড়া, অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার, কম্পিউটার শেখা, ডিজিটাল ক্লাস, বিজ্ঞানচর্চা, সবকিছু বাধাগ্রস্ত হয়। মনপুরার শিক্ষার্থীরা যদি স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সুবিধা পায়, তবে তারা দেশের মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত হতে পারবে। দ্বীপের শিশুরাও ডিজিটাল শিক্ষা, অনলাইন রিসোর্স এবং তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগ পাবে। এটি শুধু বর্তমানের সুবিধা নয়; ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরির বিনিয়োগ।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিদ্যুৎ ছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্র কার্যকর থাকে না। জরুরি সেবা, প্রসূতি সেবা, টিকা সংরক্ষণ, ল্যাব পরীক্ষা, অক্সিজেন, ফ্রিজিং ব্যবস্থা, রাতের চিকিৎসা, টেলিমেডিসিন, সবকিছুর জন্য বিদ্যুৎ অপরিহার্য। মনপুরার মতো বিচ্ছিন্ন দ্বীপে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ মানে শুধু আলো নয়; অনেক সময় জীবন বাঁচানোর সুযোগ। প্রসূতি মা, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, দুর্ঘটনাগ্রস্ত মানুষ বা জরুরি রোগীর জন্য বিদ্যুৎ-সমর্থিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা বড় আশীর্বাদ হতে পারে।
চতুর্থত, স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। মনপুরার অর্থনীতি কৃষি, মৎস্য, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ থাকলে মাছ সংরক্ষণ, বরফ তৈরি, কোল্ড স্টোরেজ, ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াজাত শিল্প, সেলাই, ওয়ার্কশপ, মিল, ডিজিটাল সেবা, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, পর্যটন সেবা, সবকিছুই শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষ করে মৎস্যজীবী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিদ্যুৎ নতুন আয়-সুযোগ তৈরি করতে পারে।
পঞ্চমত, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। ঘরে বা স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ, অনলাইন ব্যবসা, সেলাই, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, মোবাইলভিত্তিক সেবা, প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল যোগাযোগ, এসব ক্ষেত্রে নারীরা আরও সক্রিয় হতে পারবেন। বিদ্যুৎ শুধু অবকাঠামো নয়; এটি ক্ষমতায়নের হাতিয়ারও হতে পারে, যদি পরিকল্পনায় নারী, যুব ও প্রান্তিক মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ষষ্ঠত, প্রশাসনিক ও নাগরিক সেবায়ও পরিবর্তন আসবে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, ডিজিটাল সেন্টার, ভূমি সেবা, জন্মনিবন্ধন, কৃষি পরামর্শ, দুর্যোগ সতর্কতা, সামাজিক সুরক্ষা ভাতা, সব ধরনের সেবা বিদ্যুৎনির্ভর হয়ে উঠেছে। মনপুরায় স্থিতিশীল বিদ্যুৎ থাকলে এসব সেবা দ্রুত, স্বচ্ছ ও সহজলভ্য করা সম্ভব হবে।
সপ্তমত, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী হবে। উপকূলীয় দ্বীপ হিসেবে মনপুরা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি। বিদ্যুৎ থাকলে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, মোবাইল চার্জিং, আশ্রয়কেন্দ্রের আলো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা, পানি সরবরাহ এবং উদ্ধার কার্যক্রম আরও কার্যকর করা সম্ভব। দ্বীপাঞ্চলে বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে তাই জলবায়ু সহনশীলতার অংশ হিসেবে ভাবতে হবে। তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
প্রথমত, প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। সাবমেরিন কেবল স্থাপন ব্যয়বহুল ও কারিগরিভাবে জটিল। একবার স্থাপনের পর যদি তা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রক্ষণাবেক্ষণ দুর্বল থাকে বা সংযোগ স্থিতিশীল না হয়, তবে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। তাই পরিকল্পনা, ঠিকাদার নির্বাচন, কাজের মান, পরীক্ষণ, কমিশনিং ও ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় জনগণকে প্রকল্প সম্পর্কে জানানো দরকার। কোথায় কেবল যাবে, কোথায় ল্যান্ডিং স্টেশন হবে, নির্মাণকালে কী প্রভাব পড়তে পারে, মৎস্যজীবীদের চলাচল বা মাছ ধরায় কোনো সাময়িক সমস্যা হবে কি না, এসব বিষয়ে আগেভাগে তথ্য দেওয়া উচিত। উন্নয়ন তখনই জনবান্ধব হয়, যখন মানুষ জানে কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে এবং তাদের জীবনে এর প্রভাব কী।
তৃতীয়ত, পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে। নদী বা জলাশয়ভিত্তিক কোনো অবকাঠামো প্রকল্পে পরিবেশ, নদীর তলদেশ, জলজ প্রাণী, পলি, মাছের প্রজনন এবং নৌযান চলাচলের বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। উন্নয়ন ও পরিবেশকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর দরকার নেই; সঠিক পরিকল্পনা থাকলে উভয়কে সমন্বয় করা যায়।
চতুর্থত, বিদ্যুৎ আসার পর বিতরণ ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাবমেরিন কেবল স্থাপন হলো মূল সংযোগের কাজ। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে ট্রান্সফরমার, লাইন, মিটার, গ্রাহকসেবা, অভিযোগ নিম্পত্তি, বিলিং ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, লোড ব্যবস্থাপনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ শক্তিশালী না হলে সাধারণ মানুষ কাংখিত সুবিধা পাবে না। তাই প্রকল্পকে শুধু কেবল স্থাপনে সীমাবদ্ধ না রেখে পূর্ণাঙ্গ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন হিসেবে দেখতে হবে।
পঞ্চমত, বিদ্যুতের ব্যবহার উৎপাদনশীল খাতে বাড়াতে হবে। শুধু ঘরে আলো জ্বালানো নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য, ক্ষুদ্র শিল্প, নারী উদ্যোক্তা, ডিজিটাল সেবা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ কীভাবে কাজে লাগবে, সে বিষয়ে স্থানীয় পরিকল্পনা দরকার। উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, ব্যবসায়ী, কৃষক, মৎস্যজীবী, নারী সংগঠন, যুব সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ে বিদ্যুৎ-পরবর্তী উন্নয়ন পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
মনপুরার জন্য এই প্রকল্প তাই একটি সুযোগ। তবে সুযোগকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বিদ্যুৎকে উন্নয়নের কেন্দ্রীয় অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। বিদ্যুৎ এলে দোকান খোলা থাকবে বেশি সময়, শিক্ষার্থীরা পড়বে রাতে, হাসপাতাল জরুরি সেবা দিতে পারবে, মৎস্যজীবী মাছ সংরক্ষণ করতে পারবে, নারী উদ্যোক্তা উৎপাদন বাড়াতে পারবেন, তরুণরা অনলাইন কাজ বা প্রশিক্ষণে যুক্ত হতে পারবেন। অর্থাৎ বিদ্যুৎ শুধু তারের সংযোগ নয়; এটি মানুষের সম্ভাবনার সঙ্গে সংযোগ।
মনপুরা দীর্ঘদিন ধরে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে নানা সুবিধা থেকে পিছিয়ে ছিল। কিন্তু দ্বীপ হওয়া কোনো অপরাধ নয়, বিচ্ছিন্নতা কোনো নিয়তি নয়। রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনায় দ্বীপ, চর, উপকূল, হাওর, পাহাড়, এসব অঞ্চলের জন্য বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি থাকা দরকার। কারণ সেখানে সেবা পৌঁছানো কঠিন হলেও প্রয়োজন কম নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি। মনপুরার বিদ্যুৎ প্রকল্প সেই বৃহত্তর অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ভাবনার অংশ হতে পারে।
এই প্রকল্পের আরেকটি প্রতীকী তাৎপর্য আছে। সাবমেরিন কেবল নদীর তলদেশ দিয়ে যাবে, কিন্তু তার প্রভাব উঠবে মানুষের ঘরে, স্কুলে, হাসপাতালে, বাজারে, মসজিদে, মন্দিরে, ঘাটে, খামারে, মাছঘাটে এবং তরুণদের স্বপ্নে। অদৃশ্য কেবল দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে। মনপুরার মানুষ বহুদিন ধরে নদী পেরিয়ে, ঝড় সামলে, সীমাবদ্ধতার সঙ্গে বসবাস করেছে। এখন যদি স্থিতিশীল বিদ্যুৎ তাদের জীবনে নতুন গতি আনে, তবে তা হবে উন্নয়নের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার একটি উদাহরণ।
আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান প্রকল্পটির গুরুত্ব ও কারিগরি জটিলতা নির্দেশ করে। কিন্তু টেন্ডার থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সময়ানুবর্তিতা, স্বচ্ছতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীলতা জরুরি। কাগজে বড় প্রকল্প অনেক হয়; মানুষের জীবনে ফল আসে তখনই, যখন কাজ সঠিক সময়ে, সঠিক মানে, সঠিক উদ্দেশ্যে শেষ হয়।
মনপুরার মানুষের প্রত্যাশা খুব বড় নয়, কিন্তু ন্যায্য। তারা চায় আলো, স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা, কাজের সুযোগ এবং সম্মানজনক জীবন। বিদ্যুৎ সেই প্রত্যাশার একটি মৌলিক শর্ত। তাই এই প্রকল্পকে শুধু WZPDCL-এর অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে নয়, মনপুরার ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে দেখা উচিত।
দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ২৫ জুন ২০২৬ দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট এবং একই দিন বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে দরপত্র খোলা হবে। টেন্ডার ডকুমেন্টের মূল্য ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রশাসনিক ধাপগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রাথমিক অধ্যায়। এর পরের অধ্যায় হবে সঠিক ঠিকাদার নির্বাচন, মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তা মূল্যায়ন, নির্মাণকাজ, পরীক্ষণ, কমিশনিং এবং জনগণের সেবায় বিদ্যুৎ সরবরাহ।
মনপুরা দ্বীপে সাবমেরিন কেবলে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর এই উদ্যোগ সফল হলে তা শুধু একটি উপজেলার জন্য নয়; বাংলাদেশের অন্য দ্বীপ ও বিচ্ছিন্ন জনপদের জন্যও একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা রাজধানী বা বড় শহরের সীমা ছাড়িয়ে নদী, চর, দ্বীপ ও প্রান্তিক মানুষের জীবনে পৌঁছায়।
মনপুরার মানুষ যদি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের আলো পায়, তবে সেই আলো শুধু ঘর আলোকিত করবে না; আলোকিত করবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উদ্যোগ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের পথ। এই প্রকল্প তাই আশার, উন্নয়নের এবং ন্যায্যতার এক নতুন বার্তা বহন করছে। নদীর বুক পেরিয়ে আসা বিদ্যুৎ একদিন মনপুরার মানুষের জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে, এমন প্রত্যাশা করাই যায়।
###
লেখক: এ. এইচ. এম. বজলুর রহমান
ডিজিটাল গণতন্ত্র, তথ্যের অখ-তা ও গণমাধ্যম উন্নয়ন নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর
বাংলাদেশ সময়: ১১:২৮:২৪ ২০৩ বার পঠিত