
।। মোঃ বিল্লাল হোসেন জুয়েল ।।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা গত এক দশকে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল বৈশ্বিক করোনা মহামারি। ২০২০ সালে শুরু হওয়া এই সংকট শুধু স্বাস্থ্যখাতেই নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। দীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শেখার ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে। বিশেষ করে যারা তখন প্রাথমিক স্তরে ছিল, তাদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। ২০২৭ সালে যারা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে, তারা ২০২০ সালে ছিল চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তাদের শিক্ষা জীবনের ভিত্তি গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সময়টি কেটেছে অনিয়মিত ও সীমিত শিক্ষার মধ্যে।
এই বাস্তবতায় যদি ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে এগিয়ে আনা হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ এতে তাদের প্রস্তুতির সময় প্রায় তিন মাস কমে যাবে, যা ইতোমধ্যে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য আরও ক্ষতির কারণ হতে পারে।
করোনা মহামারির সময় প্রায় দেড় থেকে দুই বছর শিক্ষার্থীরা সরাসরি শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকতে পারেনি। যদিও অনলাইন ক্লাস, টেলিভিশন ক্লাস বা অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, বাস্তবে দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এ সুবিধা থেকে পুরোপুরি উপকৃত হতে পারেনি। গ্রামাঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। এর ফলে তাদের শেখার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং শহর ও গ্রামের মধ্যে শিক্ষার্থীদের শেখার বৈষম্য আরও বেড়েছে।
ইউনেস্কোর (UNESCO) তথ্য অনুযায়ী, করোনাকালীন বিশ্বব্যাপী প্রায় ১.৬ বিলিয়ন শিক্ষার্থী শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, যার মধ্যে বাংলাদেশের কয়েক কোটি শিক্ষার্থীও অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা-পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতার ঘাটতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বিশেষ করে গণিত ও ভাষাগত দক্ষতায় শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (BIDS)-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিক স্তরের প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের শ্রেণি উপযোগী পাঠ্যবই পুরোপুরি বুঝতে পারেনি করোনা-পরবর্তী সময়ে।
শুধু তাই নয়, করোনা পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থাতেও পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ সময় ঘরে থাকার ফলে তাদের মনোযোগ, অধ্যবসায় এবং পড়াশোনার অভ্যাসে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। স্কুলে ফিরে এসে তারা নতুন করে মানিয়ে নিতে সময় নিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা হলে তা উল্টো ফল দিতে পারে।
এর পাশাপাশি গত কয়েক বছরে জাতীয় শিক্ষাক্রমে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন কারিকুলাম চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও নতুন পদ্ধতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। পাঠ্যবই, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষাদানের কৌশল—সবকিছুতেই এসেছে পরিবর্তন। ফলে শিক্ষার্থীরা একটি স্থিতিশীল শিক্ষাব্যবস্থা পায়নি, বরং পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তাদের শেখার পথ অতিক্রম করতে হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে এসএসসি পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের জন্য চাপ সৃষ্টি করবে। একটি পাবলিক পরীক্ষা শুধু জ্ঞান যাচাইয়ের মাধ্যম নয়, এটি শিক্ষার্থীর মানসিক প্রস্তুতি, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই এই পরীক্ষার সময় নির্ধারণে বাস্তবতা ও শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
যদি পরীক্ষা এগিয়ে আনতেই হয়, তবে তা একসাথে তিন মাস এগিয়ে আনার পরিবর্তে ধাপে ধাপে বা সীমিত পরিসরে আনা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত হবে ২০২৭ সালের মার্চ মাসে পরীক্ষা আয়োজন করা। এতে শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত তিন মাস সময় পাবে, যা তাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। এই সময় তারা তাদের ঘাটতি পূরণ করতে পারবে, পুনরাবৃত্তি করতে পারবে এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারবে। তাছাড়া শিক্ষার্থীরা যখন নবম শ্রেণিতে ছিল তখন তাদের মানসিক প্রস্তুতিই ছিল ২০২৭ সালে মার্চ এপ্রিলে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পূরণ না করে শুধুমাত্র সময়সূচি পরিবর্তন করলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয়। বরং এতে শিক্ষার মান আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অভিভাবকরাও এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন। তারা চায় তাদের সন্তানরা পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করুক। অপ্রস্তুত অবস্থায় পরীক্ষায় বসলে শিক্ষার্থীদের ফলাফল খারাপ হতে পারে, যা তাদের আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অনেক ক্ষেত্রে এটি তাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মতামত নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। এতে করে সিদ্ধান্তটি হবে গ্রহণযোগ্য এবং কার্যকর।
করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউনিসেফ (UNICEF)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকার কারণে অনেক শিক্ষার্থী উদ্বেগ, হতাশা এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিতে ভুগছে। এই অবস্থায় তাদের ওপর অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ তৈরি করা হলে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
শিক্ষাবিদদের মতে, একটি পাবলিক পরীক্ষা কেবল জ্ঞান যাচাইয়ের মাধ্যম নয়, এটি শিক্ষার্থীর মানসিক প্রস্তুতি ও আত্মবিশ্বাসের সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বেড়ে যায়, যা তাদের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আমরা যদি সত্যিই শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে চাই, তাহলে শিক্ষার্থীদের বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিক্ষা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, এখানে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। অতএব, ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার সময় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান থাকবে তারা যেন শিক্ষার্থীদের বর্তমান অবস্থা, করোনা-পরবর্তী বাস্তবতা এবং কারিকুলাম পরিবর্তনের প্রভাব, গবেষণালব্ধ তথ্য এবং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক কল্যাণ বিবেচনায় নিয়ে একটি যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। পরীক্ষা মার্চ মাসে আয়োজন করলে তা হবে একটি সময়োপযোগী, মানবিক এবং শিক্ষাবান্ধব পদক্ষেপ।
অনেকেই যুক্তি দিতে পারেন, পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের সাথে সামঞ্জস্য রাখা সম্ভব হবে। কিংবা পরবর্তী শ্রেণিতে পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ নিশ্চিত করা, সময়সূচি সামঞ্জস্য করা নয়।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমাদের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করা। একটি সহানুভূতিশীল ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্তই পারে এই প্রজন্মকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে।
সবশেষে, শিক্ষা-সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে- শিক্ষার্থীরাই এই ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। তাদের স্বার্থ উপেক্ষা করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। সেই মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করতে হলে তড়িঘড়ি নয়, বরং দূরদর্শী ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্তই প্রয়োজন। আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নেব, তা শুধু একটি পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ করবে না—এটি নির্ধারণ করবে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।

##
লেখক: মোঃ বিল্লাল হোসেন জুয়েল,
সহকারী অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, বাংলাবাজার ফাতেমা খানম কলেজ, ভোলা
বাংলাদেশ সময়: ১৩:৩৭:১২ ৯১ বার পঠিত