
।। এ. এইচ. এম. বজলুর রহমান ।।
ভোলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে কিছু নাম শুধু পদবি বা পরিচয়ের কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকেন না; তাঁরা স্মরণীয় হয়ে থাকেন মানুষের জীবনে ছাপ রেখে যাওয়ার কারণে। মোশারেফ হোসেন শাজাহান ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদ, সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক প্রতিমন্ত্রী, নাট্যকার, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিকতার পৃষ্ঠপোষক, সমাজসেবক এবং ভোলার গণমানুষের আপনজন। কিন্তু এসব পরিচয়ের বাইরেও তাঁর আরেকটি বড় পরিচয় ছিল, তিনি ছিলেন মানবকল্যাণে নিবেদিত এক মানুষ।
আজ তাঁর ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন প্রয়াত রাজনীতিবিদকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং ভোলার সমাজজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ফিরে দেখা। যে মানুষটি রাজনীতির পাশাপাশি সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা, সামাজিক উদ্যোগ, শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, দরিদ্র মানুষের আবাসন এবং জনসেবার কাজে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন, তাঁকে স্মরণ করার মধ্যে স্থানীয় ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতাও আছে।
মোশারেফ হোসেন শাজাহান ছিলেন ভোলার ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান। ১৯৩৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ভোলা জেলায় তাঁর জন্ম। পিতা মরহুম আলতাজের রহমান তালুকদার, মাতা মাসুমা খাতুন। জন্মসূত্রে তিনি যে সামাজিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন, সেখানে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক নেতৃত্ব ও জনসংযোগের একটি ধারাবাহিকতা ছিল। কিন্তু তিনি শুধু পারিবারিক ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকেননি; নিজের কাজ, মেধা ও উদ্যোগ দিয়ে ভোলার মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছিলেন।
তাঁর জীবনের সূচনালগ্নেই দেখা যায় এক বহুমাত্রিক তরুণকে। রাজনীতিতে প্রবেশের আগেই তিনি নাটক, আবৃত্তি, সাংবাদিকতা, ফটোগ্রাফি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রজীবনেই তিনি নাটক রচনা করেন, অভিনয় করেন, সাংস্কৃতিক চর্চাকে সামাজিক সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। তাঁর রচিত নাটক ‘নীর ভাঙা ঝড়’ শুধু তাঁর সৃজনশীলতার পরিচয় নয়, বরং সমাজের ভেতরের সংকট ও মানুষের জীবনের টানাপোড়েনকে শিল্পের ভাষায় প্রকাশ করার একটি প্রয়াস।
বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত তাঁর রচিত ধারাবাহিক নাটক চর কলমির সুখ দুঃখ দর্শকমহলে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ভোলার চরাঞ্চল, নদী, ভাঙন, সংগ্রাম, মানুষের জীবন, সুখ-দুঃখ, টিকে থাকার চেষ্টা, সামাজিক সম্পর্ক, এসব বাস্তবতা তিনি বুঝতেন ভিতর থেকে। এ কারণেই তাঁর সৃষ্টিশীল কাজে স্থানীয় মানুষের জীবনধারা জায়গা পেত। তিনি সংস্কৃতিকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন মানুষকে জানার, সমাজকে বোঝার এবং বাস্তবতার সঙ্গে সংলাপ করার একটি মাধ্যম হিসেবে।
ভোলার সাংবাদিকতার ইতিহাসেও মোশারেফ হোসেন শাজাহানের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। পাকিস্তান আমলেই তিনি ভোলা থেকে পাক্ষিক মেঘনা পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। তখন ভোলা ছিল যোগাযোগব্যবস্থায় পিছিয়ে থাকা একটি দ্বীপজেলা। সংবাদপত্র প্রকাশ করা সহজ ছিল না। পত্রিকা বের করা মানে ছিল শুধু ছাপাখানার কাজ নয়; তার সঙ্গে যুক্ত ছিল সাহস, সংগঠন, জনমত তৈরি এবং স্থানীয় সমস্যাকে জনপরিসরে আনার অঙ্গীকার। সেই সময়েই তিনি বুঝেছিলেন, একটি অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য।
১৯৬৮ সালে তাঁর উদ্যোগে প্রথম ভোলা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি সেই প্রেসক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হন। প্রবীণ সাংবাদিক এম এ তাহের ছিলেন সম্পাদক। এ উদ্যোগ ভোলার সাংবাদিক সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে তিনি সাপ্তাহিক ভোলাবাণী প্রকাশের উদ্যোগ নেন। ভোলা থেকে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের ধারণাকেও তিনি উৎসাহিত করেছিলেন। আজ ভোলার গণমাধ্যমের যে বিস্তার, তার পেছনে এই প্রাথমিক উদ্যোগগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
একজন মানুষের রাজনৈতিক জীবনকে অনেকভাবে দেখা যায়। কেউ পদ দিয়ে স্মরণীয় হন, কেউ ক্ষমতা দিয়ে, কেউ বক্তব্য দিয়ে, কেউ উন্নয়নকাজ দিয়ে, কেউ আবার মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে। মোশারেফ হোসেন শাজাহানের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় অল্প বয়সে। ১৯৬৫ সালে মাত্র সাড়ে ২৫ বছর বয়সে তিনি এমপিএ নির্বাচিত হন। তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল কঠিন। আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে, প্রতিষ্ঠিত শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একজন তরুণের নির্বাচিত হওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি সেই সময়েই মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭৯ সালে বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ভোলা-১ ও ভোলা-২ আসনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং মোট ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁকে উপমন্ত্রীর মর্যাদায় বৃহত্তর বরিশালের জেলা উন্নয়ন সমন্বয়কারী মনোনীত করেন। ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রথম মন্ত্রিসভায় তিনি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী হন। ২০০১ সালে দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে তাঁকে কেবল দলীয় রাজনীতির পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর জীবনকে ছোট করা হবে। কারণ তাঁর কাজের বিস্তার দলীয় পরিসরের বাইরে গিয়েছিল। ভোলার রাস্তাঘাট, সেতু, বিদ্যুৎ, সামাজিক অবকাঠামো, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, মসজিদ নির্মাণ, দরিদ্র মানুষের আবাসন, মানবকল্যাণমূলক পদযাত্রা, স্থানীয় সংবাদপত্র, সামাজিক সংগঠন, এসব ক্ষেত্রেই তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকার কথা ভোলাবাসী স্মরণ করে।
ভোলা দীর্ঘদিন ছিল বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকা চর ও দ্বীপাঞ্চলের একটি প্রতীক। নদীভাঙন, যোগাযোগের দুর্বলতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, বিদ্যুতের অভাব, সব মিলিয়ে এই অঞ্চল উন্নয়নের মূলধারা থেকে অনেকটাই দূরে ছিল। এমন একটি এলাকায় উন্নয়নকাজ শুরু করা মানে শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়, মানুষের মধ্যে সম্ভাবনার ধারণা তৈরি করা। ১৯৬৫ সালে এমপিএ হওয়ার পর থেকেই তিনি ভোলায় উন্নয়নের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে সক্রিয় হন। তাঁর সময়েই ভোলা শহরের রাস্তাঘাট ও সেতু পাকা করার উদ্যোগ শুরু হয় বলে স্থানীয়রা স্মরণ করেন। ভোলায় বিদ্যুৎ চালুর ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকার কথা মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে বলে।
একজন জননেতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক। মোশারেফ হোসেন শাজাহানের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ ও ব্যক্তিগত। তিনি মানুষের বাড়িতে গেছেন, মানুষের দুঃখ-কষ্ট শুনেছেন, দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা করেছেন, অসহায় মানুষকে ঘর বানিয়ে দিয়েছেন, মসজিদ নির্মাণে ভূমিকা রেখেছেন, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত জাতীয় বন্ধুজন পরিষদও মানবকল্যাণ ও জনসেবামূলক কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বন্ধুজন পরিষদের মাধ্যমে তিনি মানবকল্যাণে পদযাত্রা আয়োজন করেছিলেন। সেই পদযাত্রা উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারসহ কয়েকজন মন্ত্রী। পদযাত্রা শেষে ভোলায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন মন্ত্রী এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস। এসব আয়োজনের মধ্যে ছিল জনসচেতনতা, সামাজিক সংহতি ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। রাজনীতির বাইরে সামাজিক শক্তি গড়ে তোলার এই ধারণা তখনকার সময়ের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি ভোলার দরিদ্র মানুষের জন্য কুঁড়েঘরকে টিনের ঘরে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে স্থানীয় স্মৃতিতে গভীরভাবে রয়ে গেছে। প্রায় ১০ হাজার কুঁড়েঘরকে টিনের ঘরে পরিণত করার কথা ভোলার মানুষ আজও উল্লেখ করেন। এ ধরনের কাজ শুধু আবাসন উন্নয়ন নয়; এটি দরিদ্র মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সামাজিক অবস্থান বদলে দেওয়ার কাজ। একটি পরিবার যখন কুঁড়েঘর থেকে টিনের ঘরে ওঠে, তখন শুধু বাড়ির চাল বদলায় না; বদলায় তাদের আত্মবিশ্বাস, সামাজিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ ভাবনার শক্তি।
তবে জনসেবামূলক বড় কাজের সঙ্গে ঝুঁকিও থাকে। অনেক সময় অর্থ সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানুষকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে। তাঁর জীবনও এ ধরনের চাপ থেকে মুক্ত ছিল না। কিন্তু তাঁর কাজের মূল্যায়ন করতে গেলে দেখতে হবে, তিনি মানুষের জন্য কী করতে চেয়েছিলেন, সমাজে কী রেখে গেছেন এবং যাদের জীবন বদলেছে, তারা তাঁকে কীভাবে স্মরণ করে।
মোশারেফ হোসেন শাজাহানের চরিত্রের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর সৌজন্যবোধ। তাঁকে অনেকেই “নিরেট ভদ্রলোক” হিসেবে স্মরণ করেন। রাজনীতির ভাষা অনেক সময় কঠোর হয়, দলীয় অবস্থান মানুষকে বিভক্ত করে, ক্ষমতা মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু একজন জননেতার আসল পরীক্ষা হলো, তিনি মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেন। শাজাহান ভাইয়ের ক্ষেত্রে ভোলার সাধারণ মানুষ যে স্নেহ ও সম্মানের সঙ্গে তাঁর নাম উচ্চারণ করেন, সেটিই তাঁর ব্যক্তিত্বের বড় প্রমাণ।
তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, আধুনিকমনস্ক, একই সঙ্গে ধার্মিক। এই সমন্বয় সহজ নয়। অনেকের কাছে আধুনিকতা মানে ধর্ম থেকে দূরে থাকা, আবার কারও কাছে ধর্ম মানে সংকীর্ণতা। কিন্তু তাঁর জীবন দেখায়, ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানবিকতা, সংস্কৃতিচর্চা ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি একসঙ্গে থাকতে পারে। তিনি মসজিদ নির্মাণে কাজ করেছেন, ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার সংস্কৃতি, নাটক, সাংবাদিকতা ও সামাজিক আধুনিকতার সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। এটাই তাঁর বিস্তৃত মানুষ হওয়ার পরিচয়।
ভোলার মুক্তিযুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় স্মৃতিতেও তাঁর নাম আসে। তাঁকে ভোলার প্রথম মুক্তিযোদ্ধা সংগঠকদের একজন হিসেবে স্মরণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ কেবল অস্ত্রধারণের ইতিহাস নয়; এটি সংগঠনের ইতিহাস, জনমত গঠনের ইতিহাস, সাহসের ইতিহাস, সামাজিক প্রস্তুতির ইতিহাস। স্থানীয় পর্যায়ে যারা মানুষকে সংগঠিত করেছেন, রাজনৈতিক সাহস দেখিয়েছেন, তাদের অবদান ইতিহাসের নথিতে সব সময় যথেষ্ট জায়গা পায় না। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে তারা থাকেন।
মোশারেফ হোসেন শাজাহানের জীবনকে যদি কয়েকটি শব্দে ধরতে হয়, তবে বলা যায়, তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক মানুষ। তিনি রাজনীতির মানুষ, কিন্তু শুধু রাজনীতির মানুষ নন। তিনি সংস্কৃতির মানুষ, কিন্তু শুধু সাংস্কৃতিক কর্মী নন। তিনি সমাজসেবক, কিন্তু শুধু দানশীলতার ভাষায় তাঁকে ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি সাংবাদিকতার পৃষ্ঠপোষক, কিন্তু শুধু পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোক্তা নন। তিনি ছিলেন এক ধরনের স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, যার চারপাশে ভোলার রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের বহু সুতো এসে মিলেছে।
আজকের সময়ে তাঁর জীবন থেকে কিছু শিক্ষা নেওয়া দরকার। প্রথমত, স্থানীয় নেতৃত্ব শুধু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার বিষয় নয়। একজন সত্যিকারের স্থানীয় নেতা এলাকার শিক্ষা, সংস্কৃতি, সংবাদমাধ্যম, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় জীবন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, অবকাঠামো এবং মানুষের মর্যাদার প্রশ্নকে একসঙ্গে দেখেন। দ্বিতীয়ত, রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক থাকা জরুরি। সংস্কৃতিহীন রাজনীতি কঠোর ও সংকীর্ণ হয়; আর সামাজিক দায়হীন সংস্কৃতি অনেক সময় বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শাজাহান ভাই এই দুই ধারাকে মিলিয়ে দেখেছিলেন। তৃতীয়ত, উন্নয়নকে মানুষের ঘরে পৌঁছাতে হয়। শুধু বড় প্রকল্প নয়, মানুষের মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ, পাড়ার রাস্তা, বিদ্যুৎ, মসজিদ, পত্রিকা, ক্লাব, সংগঠন, এসবও উন্নয়নের অংশ।
তাঁর ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ভোলায় কোরআনখানি, কবর জিয়ারত, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। পরিবার, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, ভোলার সাধারণ মানুষ, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাংবাদিক সমাজ তাঁকে স্মরণ করছে। এ স্মরণ শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। কারণ মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাঁর কাজ থেকে যায়। পদ চলে যায়, কিন্তু স্মৃতি থাকে। ক্ষমতার আসন ফাঁকা হয়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জায়গা থাকলে তা সহজে মুছে যায় না।
তাঁর পরিবারও ভোলার সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মেজ ভাই আলহাজ্ব গোলাম নবী আলমগীর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে পরিচিত। ছোট ভাই আলহাজ্ব গোলাম কিবরিয়া জাহাঙ্গীর সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত এবং ঢাকাস্থ ভোলা সদর উপজেলা সমিতির সভাপতি। মরহুমের পুত্র আসিফ আলতাফ সংগীতশিল্পী এবং রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তবে পরিবারের পরিচয়ের চেয়েও বড় হলো, মোশারেফ হোসেন শাজাহান নিজের কর্মের মধ্য দিয়ে যে সামাজিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, সেটি ভোলার মানুষের সম্পদ।
আমরা যখন কোনো প্রয়াত মানুষকে স্মরণ করি, তখন কেবল প্রশংসা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলোও ভাবতে হয়। ভোলার মানুষকে শিক্ষিত করা, দরিদ্র মানুষকে ঘর দেওয়া, সাংস্কৃতিক চর্চাকে এগিয়ে নেওয়া, সাংবাদিকতার স্বাধীন পরিসর তৈরি করা, ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা, আধুনিক ও মানবিক সমাজ গড়া, এসব লক্ষ্য আজও প্রাসঙ্গিক। নদীভাঙন, জলবায়ু সংকট, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, তরুণদের ভবিষ্যৎ, স্থানীয় গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ, সাংস্কৃতিক অবক্ষয়, সবকিছু মিলিয়ে ভোলার সামনে এখনও অনেক কাজ বাকি। শাজাহান ভাইয়ের স্মৃতির প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা হবে এসব কাজকে নতুন করে এগিয়ে নেওয়া।
মোশারেফ হোসেন শাজাহানকে ভোলাবাসী স্মরণ করে স্নেহের ভাষায়: “শাজাহান ভাই”। এই সম্বোধনের মধ্যে একটি রাজনৈতিক দূরত্ব নেই, আছে আত্মীয়তার অনুভূতি। জননেতার জন্য এর চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে? সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, সভাপতি, প্রতিষ্ঠাতা, লেখক, নাট্যকার, এসব পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু মানুষের মুখে যদি নামের সঙ্গে “ভাই” শব্দটি থেকে যায়, তবে বোঝা যায় তিনি মানুষের কাছে আপন ছিলেন।
আমরা ভোলাবাসী তাঁকে ভুলব না, কারণ তিনি ভোলাকে ভালোবেসেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, একটি দ্বীপজেলার মানুষকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; দরকার শিক্ষা, সংস্কৃতি, সংবাদ, আস্থা, মানবিকতা এবং জনসম্পৃক্ততা। তিনি নিজের মতো করে সেই পথেই কাজ করেছেন।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। প্রার্থনা করি, মহান আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুন, শান্তি দান করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। তাঁর পরিবার, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও ভোলার মানুষের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা ও শ্রদ্ধা।
মানবকল্যাণে নিবেদিত মানুষ ছিলেন শাজাহান ভাই। অসাম্প্রদায়িক, আধুনিকমনস্ক, ধার্মিক, স্বজনপ্রিয় এবং সংস্কৃতিবান এক মানুষের প্রতিচ্ছবি ছিলেন মোশারেফ হোসেন শাজাহান। ভোলার নিরক্ষর মানুষকে জ্ঞানের আলো দেওয়া, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, কুঁড়েঘরকে টিনের ঘরে রূপান্তর করা, মসজিদ নির্মাণে ভূমিকা রাখা, সংবাদপত্র ও প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করা এবং সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের যে চেষ্টা তিনি করে গেছেন, তা ভোলার ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকবে।
ভোলা তাঁকে স্মরণ করবে। ভোলার মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধায় রাখবে। আর তাঁর কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেবে, একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদ নয়, তার মানুষের জন্য রেখে যাওয়া ভালোবাসা।
লেখক: এ. এইচ. এম. বজলুর রহমান
ডিজিটাল গণতন্ত্র, তথ্যের অখণ্ডতা ও গণমাধ্যম উন্নয়ন নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ
দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর
বাংলাদেশ সময়: ১৭:৪৮:৫৬ ৭৩ বার পঠিত