আলহাজ্ব মুহাম্মদ শওকাত হোসেন, দৈনিক আজকের ভোলা এবং সত্যের পথে ৩৩ বছরের অগ্রযাত্রা

প্রচ্ছদ » জেলা » আলহাজ্ব মুহাম্মদ শওকাত হোসেন, দৈনিক আজকের ভোলা এবং সত্যের পথে ৩৩ বছরের অগ্রযাত্রা
সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬



---

।। এ এইচ এম. বজলুর রহমান ।।

১৯৯৪ সালের ১২ এপ্রিল ভোলার বুকে যাত্রা শুরু করেছিল প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র দৈনিক আজকের ভোলা। তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে পত্রিকাটি আজ কেবল একটি সংবাদমাধ্যম নয়, ভোলার জনজীবন, সংগ্রাম, বেদনা, সম্ভাবনা ও আত্মপরিচয়ের এক নির্ভরযোগ্য দলিল। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আলহাজ্ব মুহাম্মদ শওকাত হোসেন শুধু একজন সাংবাদিক নন, তিনি এক জনপদের কণ্ঠ নির্মাণকারী স্বপ্নদ্রষ্টা।

আজ ১২ এপ্রিল। ভোলার সংবাদ-ইতিহাসে দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, এটি এক আলোকবর্তিকার জন্মদিন। ১৯৯৪ সালের এই দিনে যে পত্রিকাটি দ্বীপজেলার মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, সেই দৈনিক আজকের ভোলা আজ ৩৩ বছরে পা দিল। একটি জেলা, একটি জনপদ, একাধিক প্রজন্মের স্মৃতি, সংগ্রাম, আস্থা ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার অনুভূতি এক হয়ে যায়।

কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সময়ের সঙ্গে শুধু বড় হয় না, ইতিহাস হয়ে ওঠে। দৈনিক আজকের ভোলা তেমনই একটি নাম। হাঁটি হাঁটি পা পা করে ৩২ বছর পেরিয়ে ৩৩-এ পদার্পণ করা এই পত্রিকার যাত্রা নিছক টিকে থাকার গল্প নয়। এটি এক জেলার জনজীবনের স্পন্দন লিপিবদ্ধ করার এক দীর্ঘ, ধৈর্যশীল ও দায়বদ্ধ সাধনা। এই পত্রিকার পাতায় ভোলার মানুষ দেখেছে নিজেদের মুখ, শুনেছে নিজেদের ভাষা, খুঁজে পেয়েছে নিজেদের বেদনা, অধিকার, আকাক্সক্ষা ও সম্ভাবনার প্রতিধ্বনি।

১৯৯৪ সালের ১২ এপ্রিল ভোলার বুকে প্রথম দৈনিক পত্রিকা হিসেবে দৈনিক আজকের ভোলা’র আত্মপ্রকাশ নিঃসন্দেহে ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। আজকের তরুণ প্রজন্ম হয়তো সহজে কল্পনা করতে পারবে না, একটি দ্বীপজেলা থেকে প্রতিদিন সংবাদপত্র প্রকাশের সিদ্ধান্ত তখন কত বড় সাহসের পরিচয় ছিল। যোগাযোগব্যবস্থা ছিল সীমিত, সংবাদ সংগ্রহ ছিল কষ্টসাধ্য, প্রযুক্তি ছিল অপ্রতুল, আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ছিল স্থায়ী সঙ্গী। রাজধানীকেন্দ্রিক সংবাদপ্রবাহের বাইরে দাঁড়িয়ে একটি জেলার নিজস্ব কণ্ঠ গড়ে তুলতে হলে শুধু পেশাগত দক্ষতা নয়, প্রয়োজন ছিল একধরনের নৈতিক জেদ, জনপদের প্রতি দায়বোধ এবং ভবিষ্যৎকে আগেভাগে চিনে নেওয়ার ক্ষমতা।

সেই দূরদৃষ্টি ও সাহসের নাম আলহাজ্ব মুহাম্মদ শওকাত হোসেন। তিনি শুধু একজন সাংবাদিক নন; তিনি লেখক, কলামিস্ট, শিক্ষাবিদ, সংগঠক এবং সর্বোপরি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি বুঝেছিলেন, ভোলার মতো দ্বীপজেলার মানুষকে কেবল জাতীয় সংবাদপত্রের অপ্রতুল উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে রাখা যাবে না। তাদের নিজেদের কথা বলার একটি মঞ্চ দরকার, নিজেদের সমস্যা নিজেরা উচ্চারণ করার একটি জায়গা দরকার, নিজেদের সম্ভাবনাকে দৃশ্যমান করার একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম দরকার। সেই প্রয়োজন থেকেই জন্ম নিয়েছিল দৈনিক আজকের ভোলা।

একটি সংবাদপত্রের জন্ম মানে কেবল কিছু খবর ছাপা নয়। এর অর্থ একটি সমাজকে তার নিজের আয়না ফিরিয়ে দেওয়া। দৈনিক আজকের ভোলা সেই আয়নাটিই হয়ে উঠেছিল। নদীভাঙনের দীর্ঘশ্বাস, চরাঞ্চলের অনিশ্চিত জীবন, কৃষকের দুশ্চিন্তা, জেলের ঝুঁকিপূর্ণ উপার্জন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি, প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনা, সামাজিক অবিচার, স্থানীয় রাজনীতির দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক উদাসীনতা, আবার একই সঙ্গে ছোট ছোট সাফল্য, উন্নয়নের স্বপ্ন, সাংস্কৃতিক প্রাণশক্তি, নাগরিক উদ্যোগ এবং ভোলার বিপুল সম্ভাবনা, সবই এই পত্রিকার পাতায় জায়গা পেয়েছে। ফলে এটি নিছক তথ্যবাহক হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে ভোলাবাসীর আস্থার এক নৈতিক প্রতিষ্ঠান।

শওকাত হোসেনের সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এই যে, তিনি সংবাদকে কখনো শুষ্ক তথ্যের স্তূপ হিসেবে দেখেননি। তিনি দেখেছেন সংবাদকে মানুষের জীবনযাপনের দলিল হিসেবে। তিনি জানতেন, জনপদের ভেতর থেকে উঠে আসা ছোট্ট একটি ঘটনাও অনেক সময় বৃহত্তর সত্যকে উন্মোচন করে। তিনি জানতেন, মাঠের মানুষের কষ্ট কীভাবে ভাষা পায়, বঞ্চনা কীভাবে প্রতিবাদে রূপ নেয়, আর অনুচ্চারিত বেদনা কীভাবে জনস্বার্থের প্রশ্ন হয়ে ওঠে। স্থানীয় সাংবাদিকতার শক্তি এখানেই, এটি মানুষের খুব কাছে থাকে। জাতীয় সংবাদমাধ্যম যেখানে দূর থেকে দেখে, স্থানীয় পত্রিকা সেখানে কাছ থেকে অনুভব করে। শওকাত হোসেন এই অনুভবের জায়গাটিকেই সম্পাদকীয় শক্তিতে রূপ দিয়েছিলেন।

আমার নিজের জীবনের সঙ্গে এই ইতিহাসের সম্পর্কও গভীর। আলহাজ্ব মুহাম্মদ শওকাত হোসেন আমার কাছে শুধু এক প্রবীণ সাংবাদিক নন, তিনি দীর্ঘদিনের মেন্টর, সিনিয়র বন্ধু এবং প্রেরণার মানুষ। আমার জন্মভূমিও ভোলা। লালমোহন উপজেলার ফুলবাগিচা গ্রাম আমার শিকড়, আমার শৈশবের প্রথম ভূগোল। এখন আমি ঢাকায় থাকি, কিন্তু ভোলার নদী, মাটি, মানুষ ও জনজীবনের স্মৃতি আমার ভেতরে আজও বেঁচে আছে। ১৯৯৮ সালে আমি ভোলা সরকারি কলেজ থেকে ¯œাতক সম্পন্ন করি। পরে দ্য ডেইলি স্টার এবং ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি)-এর স্টাফ করেসপন্ডেন্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু তারও আগে, স্থানীয় সাংবাদিকতার যে মানবিক, নৈতিক ও পেশাগত পাঠ, তার বড় অংশই আমি পেয়েছি শওকাত হোসেনের সান্নিধ্যে।

আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি বরিশাল জেলা পরিষদ প্রকাশিত বাকেরগঞ্জ পরিক্রমা পত্রিকায়। সেখানে আলহাজ্ব মুহাম্মদ শওকাত হোসেন ছিলেন ভোলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, আর আমি ছিলাম লালমোহন করেসপন্ডেন্ট। সেই সময়ের সাংবাদিকতা ছিল আজকের তুলনায় অনেক বেশি কষ্টসাধ্য, অনেক বেশি মাটি-ঘেঁষা, অনেক বেশি মানুষনির্ভর। তখন সংবাদ সংগ্রহে প্রযুক্তির আরাম ছিল না, ছিল মানুষের কাছে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা। পথে নামতে হতো, সময় দিতে হতো, অপেক্ষা করতে হতো, ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হতো। সংবাদ তখন ডেস্কে বসে তৈরি হতো না; মানুষের জীবন থেকে উঠে আসত। শওকাত হোসেন সেই কাজটিই করতেন অসাধারণ নিষ্ঠা, ধৈর্য ও সততার সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি, সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর নৈতিক দায়িত্ব।

একসময় তিনি ভোলা দ্বীপ থেকে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে পরামর্শ শুরু করেছিলেন। তখন অনেকেই তাঁকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। বলা হয়েছিল, ভোলা থেকে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ অসম্ভব। কেউ বলেছিলেন, এটি টিকবে না। কেউ বলেছিলেন, পাঠকসংখ্যা যথেষ্ট হবে না। কেউ কেউ দ্বীপজেলার ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাকেই অজুহাত করে স্বপ্নটিকে অবাস্তব আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাসে বড় কাজগুলো অনেক সময় শুরু হয় সংশয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। শওকাত হোসেন সেই সংশয়ের কাছে হার মানেননি। আমিও তাঁকে উৎসাহিত করেছিলাম ভোলা থেকে প্রথম দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের জন্য। আজ ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই উৎসাহ ছিল এক স্বপ্নের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষুদ্র দায়। আর আজ সেই স্বপ্নের নাম দৈনিক আজকের ভোলা, যা ৩৩ বছরের দীর্ঘ পথচলায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে বাস্তবতার অনমনীয় শক্তি হিসেবে।

দীর্ঘ এই পথচলায় শওকাত হোসেন যে নিষ্ঠা, ধৈর্য, সততা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন, তা অনুকরণীয়। একটি স্থানীয় পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করা যেমন কঠিন, তার চেয়েও কঠিন তাকে টিকিয়ে রাখা, পাঠকের আস্থা ধরে রাখা, মান বজায় রাখা, প্রতিকূলতার মধ্যেও চলমান রাখা। এখানে আছে আর্থিক ঝুঁকি, সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক জটিলতা, সীমিত স¤পদ, অনিশ্চিত বাজার এবং প্রতিদিনের লড়াই। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন, একটি পত্রিকার প্রকৃত শক্তি তার মুদ্রণযন্ত্রে নয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতায়। এই বিশ্বাসই তাকে ৩৩ বছরের অগ্রযাত্রায় স্থায়ী ভিত্তি দিয়েছে।

সংবাদপত্রের প্রাণ হলো আস্থা। আর আস্থা জন্ম নেয় বস্তুনিষ্ঠতা, দায়িত্বশীলতা, সংযম ও নৈতিকতার ভেতর দিয়ে। দৈনিক আজকের ভোলা তার জন্মলগ্ন থেকেই সে চর্চা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। স্থানীয় সংবাদপত্রের জন্য এই কাজ আরও কঠিন। কারণ এখানে সবাই সবার পরিচিত, সম্পর্কের জাল আরও ঘন, চাপ আরও প্রত্যক্ষ, আর সম্পদ আরও সীমিত। তবু একটি পত্রিকা যদি সত্যের পাশে থাকে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে, মানুষের ভাষা হয়ে ওঠে, তবে শেষ পর্যন্ত সেই পত্রিকাই মানুষের ভালোবাসা পায়। দৈনিক আজকের ভোলা সেই অর্থে কেবল একটি দৈনিক নয়, বহু মানুষের কাছে এটি নৈতিক আশ্রয়।

ভোলার মতো দ্বীপজেলার জন্য স্থানীয় গণমাধ্যমের গুরুত্ব আলাদা। জাতীয় সংবাদপত্র বড় প্রেক্ষাপট তুলে ধরে, কিন্তু স্থানীয় পত্রিকা ধরে রাখে প্রতিদিনের জীবন। কোন সড়ক বছরের পর বছর ভাঙা, কোন ইউনিয়নের মানুষ নৌকানির্ভর, কোথায় নদীভাঙনে পরিবার নিঃস্ব, কোন হাসপাতালে চিকিৎসক নেই, কোন স্কুলে শিক্ষকসংকট, কোথায় কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, কোন জেলে জীবন বাজি রেখে সাগরে নামছেন, কোথায় উন্নয়নের নামে মানুষের অধিকার উপেক্ষিত হচ্ছে, এই বাস্তবতা স্থানীয় সংবাদপত্রই সবচেয়ে গভীরভাবে তুলে ধরতে পারে। দৈনিক আজকের ভোলা এই দায়িত্ব পালন করেছে বলেই এটি ভোলার ইতিহাসের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে।

এই পত্রিকার আরেকটি বড় শক্তি হলো, এটি শুধু সমস্যার সংবাদ ছাপেনি; সম্ভাবনার কথাও বলেছে। ভোলা শুধু দুর্যোগের নাম নয়, সম্ভাবনারও নাম। কৃষি, মৎস্য, নৌপথ, উপকূলীয় অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, পর্যটন, মানবস¤পদ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও ভোলার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। দায়িত্বশীল সংবাদপত্র যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, তেমনি সম্ভাবনার পথও আলোকিত করে। দৈনিক আজকের ভোলা সেই অর্থে প্রতিবাদের কণ্ঠ যেমন, তেমনি আশারও আলো।

পাঠকপ্রিয়তা কোনো পত্রিকার জন্য শুধু প্রচারসংখ্যার হিসাব নয়; এটি সামাজিক সম্পর্কেরও পরিমাপ। মানুষ সেই পত্রিকাকেই আপন মনে করে, যেখানে সে নিজের মুখ দেখতে পায়। দৈনিক আজকের ভোলা ভোলাবাসীর আপন হয়ে উঠেছে বলেই এর সঙ্গে এমন আবেগ জড়িয়ে আছে। কারও প্রথম লেখা এখানে ছাপা হয়েছে, কারও সামাজিক উদ্যোগ পরিচিতি পেয়েছে, কারও প্রতিবাদের ভাষা তৈরি হয়েছে, কারও বিচার চাওয়ার পথ খুলেছে। ফলে এই পত্রিকা শুধু খবরের কাগজ নয়; এটি বহু মানুষের জীবনস্মৃতিরও অংশ।

শওকাত হোসেনকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, তিনি শুধু সংবাদ সংগ্রহ করতেন না, সংবাদকে বুঝতেনও। তাঁর ভেতরে একজন সাংবাদিক যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন একজন সংগঠক, শিক্ষক, লেখক এবং সমাজমনস্ক সম্পাদক। একজন ভালো সম্পাদক কেবল খবর বাছাই করেন না; তিনি সময়ের ভাষা বোঝেন, সমাজের নাড়ি বোঝেন, পাঠকের মন বোঝেন এবং ঠিক করেন কোন বিষয়ে কাগজের নৈতিক অবস্থান কোথায় হবে। তিনি জানেন কোথায় প্রতিবাদ প্রয়োজন, কোথায় সংযম প্রয়োজন, কোথায় মানবিকতা অগ্রাধিকার পাবে। এই জায়গায় শওকাত হোসেন নিঃসন্দেহে সফল। মাঠের সাংবাদিকতা থেকে স¤পাদকীয় নেতৃত্বে তাঁর উত্তরণ প্রমাণ করে, মাটির কাছে থাকা মানুষই প্রকৃত অর্থে গণমানুষের সম্পাদক হয়ে উঠতে পারেন।

আজ সংবাদমাধ্যম এক নতুন সময়ে দাঁড়িয়ে। ডিজিটাল যুগ শুধু মাধ্যম বদল করেনি, বদলে দিয়েছে সংবাদপাঠের অভ্যাস, গতি এবং চরিত্রও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন পোর্টাল, মোবাইল-ভিত্তিক আপডেট, ভিডিও কনটেন্ট এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ভেতর দিয়ে সংবাদ এখন ছুটে চলে চোখের পলকে। কিন্তু এই গতি এক নতুন সংকটও তৈরি করেছে: তথ্যের ভিড়ে সত্যের সংকট। ভুয়া খবর, অর্ধসত্য, উসকানিমূলক ভাষ্য, যাচাইহীন প্রচার এবং মনোযোগ-নির্ভর সংবাদ সংস্কৃতি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

এই বাস্তবতায় দৈনিক আজকের ভোলা’র সামনে যেমন ঝুঁকি আছে, তেমনি সুযোগও আছে। ঐতিহ্য, আঞ্চলিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও নৈতিক অবস্থান বজায় রেখে পত্রিকাটিকে প্রযুক্তির সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে হবে। ডিজিটাল আর্কাইভ, শক্তিশালী অনলাইন সংস্করণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল উপস্থিতি, দ্রুত সংবাদ হালনাগাদ, তথ্যযাচাইভিত্তিক প্রতিবেদন, তরুণ পাঠকের সঙ্গে নতুন সংযোগ, ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং, সবই এখন সময়ের দাবি। কারণ সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যৎ শুধু ছাপার অক্ষরে নয়, ডিজিটাল পর্দাতেও লেখা হচ্ছে। তবে মাধ্যম বদলালেও সাংবাদিকতার মূল মূল্যবোধ বদলায় না। সত্য, বস্তুনিষ্ঠতা, মানবিকতা ও দায়বদ্ধতাই শেষ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমকে টিকিয়ে রাখে। দৈনিক আজকের ভোলা যদি তার এই মৌলিক শক্তিকে ডিজিটাল অভিযাত্রার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তবে তার আগামী আরও উজ্জ্বল হবে।

আজ এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই শুধু শুভেচ্ছা জানালেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং নতুন প্রত্যাশাও উচ্চারণ করতে হয়। প্রত্যাশা থাকে, এই পত্রিকা আগামী দিনেও ভোলার মানুষের অধিকার, স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ন্যায়ের পক্ষে একই দৃঢ়তায় কলম ধরবে। প্রত্যাশা থাকে, এটি নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য এক অনন্য শিক্ষালয় হয়ে উঠবে। প্রত্যাশা থাকে, স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক চর্চা, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করতে দৈনিক আজকের ভোলা তার বলিষ্ঠ ভূমিকা বজায় রাখবে।

একটি পত্রিকা কেবল সম্পাদক, প্রতিবেদক বা ছাপাখানার শ্রমে টিকে থাকে না। এটি টিকে থাকে পাঠকের ভালোবাসায়, শুভানুধ্যায়ীদের সমর্থনে, লেখকদের অবদানে, সংবাদকর্মীদের নিষ্ঠায় এবং সমাজের সম্মিলিত আস্থায়। দৈনিক আজকের ভোলা এই দীর্ঘ পথচলায় যে ভালোবাসা অর্জন করেছে, সেটিই তার সবচেয়ে বড় স¤পদ। অর্থ দিয়ে যার মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। কারণ একটি পত্রিকা যখন মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে, তখন সেটি আর শুধু প্রতিষ্ঠান থাকে না; স্মৃতি হয়ে যায়, সম্পর্ক হয়ে যায়, জনপদের সম্মিলিত চেতনার অংশ হয়ে যায়।

এই বিশেষ দিনে সেই ঐতিহাসিক উদ্বোধনের কথাও স্মরণ করা প্রয়োজন। ১৯৯৪ সালের ১২ এপ্রিল, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা প্রধান অতিথি হিসেবে দৈনিক আজকের ভোলা-র শুভ উদ্বোধন করেন। সেই সূচনা নিছক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এটি ছিল ভোলার সাংবাদিকতা, জনমত ও নাগরিক সমাজে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। তিন দশকের বেশি সময় পরে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, সেই শুরু কত গভীর তাৎপর্য বহন করেছিল।

আজ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি আলহাজ্ব মুহাম্মদ শওকাত হোসেন-কে, যাঁর হাতে বোনা স্বপ্ন আজও ভোলার সংবাদভুবনকে আলোকিত করে। একই সঙ্গে শুভেচ্ছা জানাই দৈনিক আজকের ভোলা–র সঙ্গে জড়িত সব সাংবাদিক, সংবাদকর্মী, লেখক, মুদ্রাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের। তাঁদের শ্রম, নিষ্ঠা ও ভালোবাসাই এই প্রতিষ্ঠানকে জীবন্ত রেখেছে।

আমার ব্যক্তিগত অনুভূতিতে দৈনিক আজকের ভোলা শুধু একটি পত্রিকার নাম নয়; এটি ভালোবাসার, আস্থার, স্মৃতির এবং আত্মপরিচয়ের এক অনিবার্য অংশ। এই পত্রিকা বেঁচে থাকুক সত্যের সাহসে, ন্যায়ের আহ্বানে, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারে। এটি বেঁচে থাকুক ভোলার ঘরে ঘরে, পাঠকের হাতে হাতে, নতুন প্রজন্মের বিবেকে ও বোধে। সকলের দোয়া, ভালোবাসা ও সমর্থন নিয়ে দৈনিক আজকের ভোলা আরও বহু বছর ধরে তার আলোকিত যাত্রা অব্যাহত রাখুক, এটাই প্রত্যাশা।

শুভ জন্মদিন, দৈনিক আজকের ভোলা।

সত্য, সাহস ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এই যাত্রা দীর্ঘ হোক।

দ্বীপজেলার ইতিহাসে যেমন তোমার নাম লেখা আছে, তেমনি আগামী দিনের ইতিহাসেও তুমি উজ্জ্বল হয়ে থাকো।

##

এ এইচ এম. বজলুর রহমান,

ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, তথ্যের অখ-তা ও ডিজিটাল গণতন্ত্রবিষয়ক

নীতি-পরামর্শক, বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (অগজ) বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর

বাংলাদেশ সময়: ১৯:৫৮:৩০   ২৪০ বার পঠিত  







পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

জেলা’র আরও খবর


ভোলায় বিনিয়োগে আগ্রহী আলজেরিয়া: রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের ফলপ্রসূ আলোচনা
ভোলায় ৫ম শ্রেণির স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ: ধর্ষক গ্রেফতার, ভিকটিমকে দেখতে হাসপাতালে পুলিশ সুপার
ভোলায় আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূতের সাথে পুলিশ সুপারের সৌজন্য সাক্ষাৎ
ভোলায় ৫০ পিস ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার; নগদ প্রায় ৬ লাখ টাকা জব্দ
সাংবাদিকদের উন্নয়নে জেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক তাদের পাশে থাকবে: জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান
২ দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার
ভোলায় কোটি টাকার সামুদ্রিক ইলিশ জব্দ
ইলিশ উধাও, জলবায়ু পরিবর্তনকে দুষছেন গবেষকরা
ভোলায় কোরবানিকে ঘিরে গরু মোটাতাজাকরণে ব্যস্ত খামারিরা, ভারতীয় গরু নিয়ে দুশ্চিন্তা
ঝড়-বৃষ্টিতে ভোলায় কৃষকদের স্বপ্ন ডুবে আছে পানিতে, ক্ষতি ২১ কোটি টাকা



আর্কাইভ