
॥ মুহাম্মদ শওকাত হোসেন ॥
একটা সময় ছিল যখন ঢাকা থেকে দৈনিক পত্রিকা ভোলায় আসতো একদিন পরে। তাও দুপুরবেলা ইসলাম পেপার হাউজে পত্রিকা পৌঁছতো। পাঠকরা হাতে পেত বিকেল কিংবা সন্ধ্যায়। ঢাকা থেকে তখন দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদ, দৈনিক বাংলা, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক সংগ্রামসহ মাত্র সাত আটটি পত্রিকা প্রকাশ হতো। তাও সর্বোচ্চ আট পৃষ্ঠার পত্রিকা পাওয়া যেত। এর বেশিরভাগই লেটার প্রেসে ছাপা হতো। তখনকার দিনে ঢাকার পত্রিকায় ভোলার কেন হ্যাঁ মফস্বলের সংবাদ থাকত না বললেই চলে। ভোলার সংবাদ তখনই থাকতো যখন বড় ধরনের দুর্যোগে ভোলার অনেক মানুষ মারা যেত, ক্ষয়ক্ষতি হত, তখন জাতীয় পত্রিকায় ভোলার সংবাদ দেখা যেত। এরপর কালে ভদ্রে ভেতরের পাতায় মফস্বল নিউজের সাথে কখনো বা সিঙ্গেল কলাম ছোট্ট একটি সংবাদ দেখলেই আমরা আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মত আনন্দে উল্লাসিত হতাম। আর মনে মনে ভাবতাম আহা….. ভোলা থেকে যদি একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করা যেত…..। তাহলে প্রতিদিনই ভোলার ভালো-মন্দ মিলিয়ে অনেক সংবাদ আমরা একসাথে হাতের মুঠোয় পেতাম। ছাত্র-জীবন থেকে মনের মধ্যে এ ধরনের একটি আশা পোষণ করে আসছি। মহান আল্লাহর অসীম রহমতে আজ থেকে ৩৩ বছর আগে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়েছিল এবং আল্লাহ তা বাস্তবায়ন করিয়েছেন আমার হাত দিয়ে। নিঃসন্দেহে এটা আমার জীবনের বিশাল সফলতা। তাই আজকের দিনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।
১৯৭৬ সাল থেকে বরিশাল জেলা পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত বাকেরগঞ্জ পরিক্রমা এর ভোলার সংবাদদাতা হিসেবে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। ১৯৮০ সালে ভোলা থেকে প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক ভোলা বাণী’ প্রকাশনায় মরহুম মোশারেফ হোসেন শাজাহান ভাইয়ের সঙ্গে অন্যতম সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যকালীন সময়ে এবং পরবর্তীতে সৌদি আরবে স্ট্যাডির সময়ও আমি পত্র-পত্রিকার সাথে বিভিন্নভাবে যুক্ত ছিলাম। ৯০-এর গণঅভ্যূত্থানের পরে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ভোলার সুযোগ্য সামাজিক ব্যক্তিত্ব মরহুম মোশারেফ হোসেন শাজাহান আমাকে ভোলা থেকে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। তাই ঢাকায় আমার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘আকস এডভার্টাইজিং’ বন্ধ করে দিয়ে ভোলা এসে ১৯৯১ সালে জেলা প্রশাসক মোঃ ইদ্রিস মিয়া এর কাছ থেকে প্রথম ‘দৈনিক আজকের ভোলা’ এর ডিক্লারেশন নেই। কিন্তু আনুষাঙ্গিক নানাবিধ কারণে পত্রিকা প্রকাশনায় যেতে ব্যর্থ হই।
ডিক্লারেশন এর তিন মাসের মধ্যে পত্রিকা প্রকাশনা করলে সংবাদপত্রের বিধি অনুযায়ী অটোমেটিক ভাবে ডিক্লারেশন বাতিল হয়ে যায়। সে মুহূর্তে পত্রিকা প্রকাশে সক্ষম না হলেও আমি কিন্তু আশা ছেড়ে দেইনি। বরং পত্রিকা প্রকাশনারর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকি। এরই অংশ হিসেবে ১৯৯২ সালে ভোলায় প্রতিষ্ঠা করি ‘স্বদেশ প্রিন্টিং প্রেস’। ১৯৯৪ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মরহুম মোঃ সিকান্দার আলী মন্ডল এবং পুলিশ সুপার মরহুম জামশেদ উদ্দিন ভূঁইয়া এর বিশেষ অনুপ্রেরণায় পত্রিকা প্রকাশনার উদ্যোগ গ্রহণ করি। মোশারেফ হোসেন শাজাহান ভাই তখন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী। তারই উদ্যোগে সে বছর ভোলায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘উন্নয়নে উৎসবে ভোলা’ সেই সপ্তাহের মাঝখানে একটি দিনে অর্থাৎ ১২ এপ্রিল ১৯৯৪ ভোলা কবি মোজাম্মেল হক টাউন হলে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার হাত দিয়ে ‘দৈনিক আজকের ভোলা’র প্রকাশনা শুরু হয়। এ সময় জেলা প্রশাসক সিকান্দার আলী মন্ডল এর কাছ থেকে পুনরায় ডিক্লারেশন নিয়েছিলাম। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী মরহুম ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। বিশেষ অতিথি ছিলেন, ভোলার কৃতি সন্তান তৎকালীন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মরহুম মোশারেফ হোসেন শাজাহান।
তারপরের অনেক ইতিহাস। দীর্ঘ প্রায় দেড় যূগ চরম বিজ্ঞাপন বৈষম্যের শিকার হয়েছি। বহুঘাত প্রতিঘাত প্রতিনিয়ত নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের খাস রহমতে আমাদের প্রিয় পাঠকবৃন্দ ও শুভাকাংখিদের একান্ত ইচ্ছা ও সহযোগিতায় ‘দৈনিক আজকের ভোলা’ ৩২ বছর পেরিয়ে আজ ৩৩ বছরে পা দিল।
এই নশ্বর পৃথিবীতে কেউ অবিনশ্বর নয়। আমি আপনি সকলকে এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে এক সময় চলে যেতে হবে। আমাদের কর্ম ও কার্যক্রম বিশেষ করে সৎ কাজগুলো আমাদের ইহ ও পরকালীন জীবনে পাথেয় হয়ে থাকবে। আজকের ভোলার প্রথম দিন থেকে আমরা সৎ সাংবাদিকতা, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ রক্ষা করে সত্য সুন্দর ও মানবতার পথে পত্রিকা পরিচালনা করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছি। দীর্ঘকালব্যাপী আমরা একটা পজেটিভ ইমেজ আল্লাহর রহমতে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি। দৈনিক আজকের ভোলা ভবিষ্যতেও সেই ইমেজ রক্ষা করে সততার পথে সত্য ও সুন্দরের প্রকাশ অব্যাহত রাখবে।
আজকের দিনে আমাদের সকল পাঠক-পাটিকা শুভাকাংখী, বিজ্ঞাপনদাতা এবং সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আমাদের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ। পবিত্র কোরআনের বাণী যা আমরা প্রথম থেকে বহন করে এনেছি ‘সত্য সমাগত অসত্য বিতাড়িত সত্যের জয় হবেই’ এই বাণী আমাদের পাথেয়। আর সর্বাবস্থায় আমরা আমাদের নীতি-নৈতিকতা রক্ষা করে সত্য ও সুন্দরের উপরে অটল রয়েছি। তাই আজকের দিনেও আমাদের সেই শ্লোগানটাই সবাইকে বলবো আমাদের প্রিয় জাতীয় কবির ভাষায় ‘অসত্যের কাছে কভু নত নহে শির, ভয়ে কাপে কাপুরুষ লয়ে যায় বীর’। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও আমাদের বিগত দিনে অনুসৃত নীতি এবং বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন রেখে দৈনিক আজকের ভোলা শত প্রতিকূলতার মধ্যেও আগামীর পথে সত্য সুন্দরের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাবে।আমাদের কলাকুশলী, পত্রিকার সাংবাদিকবৃন্দ, প্রেসের কর্মচারীবৃন্দ, পত্রিকা বহনকারী হকারসহ সকলের প্রতি আমাদের শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ।
বাংলাদেশ সময়: ১:০৮:৩২ ৯৭ বার পঠিত