
।। ডা. এএসএম মাহমুদুজ্জামান ।।
সম্প্রতি শিশুদের মধ্যে হাম বা মিজেলসের প্রাদুর্ভাব কিছুটা বেড়েছে। এটি কেবল একটি সাধারণ জ্বর বা চর্মরোগ নয়, বরং সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে এটি শিশুর জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। হাম নিয়ে অভিভাবকদের মনে থাকা সাধারণ কিছু প্রশ্ন এবং এর সমাধান নিয়ে আজকের এই প্রশ্ন-উত্তর পর্ব।
১. হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলো কি কি?
হামের শুরুটা হয় উচ্চমাত্রার জ্বর দিয়ে। এর সঙ্গে কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং অনবরত নাক দিয়ে পানি পড়তে পারে। জ্বরের প্রায় চার দিনের মাথায় কান বা গলার নিচ থেকে লালচে র্যাশ বা দানা বের হতে শুরু করে এবং দ্রুত তা মুখম-ল হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
২. হাম কতটা ছোঁয়াচে এবং এর জটিলতাসমূহ কি?
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাল রোগ। এটি মূলত শ্বাসনালীর মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে ভেঙে দেয়। এর ফলে পরবর্তী সময়ে নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, কান পাকা, মুখে ঘা এবং এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে। শরীরের ভিটামিন ‘এ’ কমে যাওয়ার ফলে চোখের শুষ্কতা থেকে শুরু করে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে।
৩. জ্বরের সঙ্গে র্যাশ মানেই কি হাম?
জ্বরের সঙ্গে র্যাশ মানেই সবসময় হাম নয়। জার্মান হাম (রুবেলা), ভাইরাল একজ্যান্থেম (ভাইরাসজনিত র্যাশ) ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়াতেও এমনটা হতে পারে। তবে উচ্চ জ্বর, চোখ লাল হওয়া এবং গলার নিচ থেকে র্যাশ শুরু হওয়া হামের জোরালো লক্ষণ। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া র্যাশ আক্রান্ত প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৮ জনই মূলত হামে আক্রান্ত আর বাকি ২ জন জার্মান হাম বা রুবেলা ভাইরাসে আক্রান্ত।
৪. হাম নিশ্চিতে কি কি পরীক্ষা করা যায়?
* ওমগ অ্যান্টিবডি টেস্ট: এর মাধ্যমে শরীরে সক্রিয় হামের সংক্রমণ আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়।
* আরটি-পিসিআর: নাক, গলা বা প্রস্রাবের নমুনা থেকে ভাইরাস শনাক্ত করা হয়।
৫. হামের ঝুঁকিতে কারা বেশি?
* মায়ের বুকের দুধ না পাওয়া শিশু
* বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সী শিশু যারা টিকা নেয়নি
* অপুষ্টিতে (বিশেষ করে ভিটামিন-এ এর অভাব) ভোগা শিশুরা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
* গর্ভবতী নারী
* দুর্বল ইমিউনিটির শিশু
* ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী শিশুরা
৬. হামে আক্রান্ত শিশুর ক্ষেত্রে অভিবাবকদের করণীয় কী?
* র্যাশ দেখা দেওয়ার দিন থেকে অন্তত ৫ দিন শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা বা ‘আইসোলেশনে’ রাখুন।
* পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত তরল পানীয় নিশ্চিত করুন।
* জ্বর বা র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৭. শিশুকে কখন হাসপাতালে ভর্তি করাবেন? (হামের বিপদচিহ্নগুলো কি কি?)
শিশুর মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিন:
* শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া।
* বারবার বমি বা মারাত্মক দুর্বলতা।
* খিঁচুনি বা নিস্তেজ হয়ে পড়া।
* চোখের মণি ঘোলাটে হওয়া বা দৃষ্টিতে সমস্যা।
* মুখে গভীর ঘা দেখা দেওয়া।
৮. হামের চিকিৎসা কি ও ভিটামিন ‘এ’-এর প্রয়োজনীয়তা কি?
হামের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ঔষধ নেই। ব্যবস্থাপনা প্রাথমিকভাবে সহায়ক এবং লক্ষণ উপশম এবং জটিলতা প্রতিরোধের উপর জোর দেয়া হয়, যেমন
* জ্বর হলে প্যারাসিটামল,
* চুলকানি থাকলে এন্টিহিস্টামিন,
* পরপর দুইদিন বয়স অনুযায়ী সঠিক ডোজে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে।
* যদি হামে আক্রান্ত কোনো শিশুর দৃষ্টি সমস্যা বা দেখতে অসুবিধা হয়, কিংবা চোখের মণি ঘোলা লাগে, তাহলে ১৪ দিনের মাথায় আরও একটা ভিটামিন এ ক্যাপসুল (মোট ৩টি) দিতে হবে।
* চোখে বা কানে সংক্রমণ হলে চোখ, কান ও মুখে এন্টিবায়টিক বা এন্টিফাঙ্গাল ড্রপ/ক্রিম ব্যবহার করতে হয়।
* নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়া আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মুখে বা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে শিরা পথে অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
৯. টিকা নেওয়ার পরও শিশুদের হাম হচ্ছে কেন?
এর কারণ, এখনো অনেক জায়গায় অনেক শিশু এই ‘এমআর’ টিকা পায়নি বা কেউ কেউ একটা নিয়েছে। এর ফলে এসব টিকাবঞ্চিত শিশুর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যেমন বেশি, আক্রান্ত হলে অন্যদের মধ্যে ছড়ানোর আশঙ্কাও অনেক বেশি। আবার অনেক সময় টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের শরীরে আশানুরূপ হাম প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরি না হলেও সে পুনরায় হামে আক্রান্ত হতে পারে।
১০. যেসব শিশু এখনো হাম টিকা গ্রহণ করেনি বা পূর্ণ ডোজ (২টি) সম্পন্ন করেনি, তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী করণীয় কি হওয়া উচিত?
রোববার (৫ এপ্রিল) থেকে বাংলাদেশে বিশাল পরিসরে হাম-রুবেলা (গজ) ক্যা¤েপইন শুরু হতে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সি প্রায় ২ কোটির বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। আগে টিকা নেওয়া থাকলেও আপনার শিশুকে এই ক্যা¤েপইনে অবশ্যই টিকা দিন।
১১. গর্ভবতী নারী ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পরামর্শ কি?
* কারো জীবনে একবার হাম হয়ে থাকলে তবে সেটি তাকে আজীবন সুরক্ষা দেয়।
* গর্ভবতী: গর্ভাবস্থায় হামের টিকা নেওয়া সাধারণত নিষিদ্ধ, কারণ এটি ভ্রƒণের ক্ষতি করতে পারে।
* প্রাপ্তবয়স্ক: প্রাপ্তবয়স্কদের কারো যদি আগে হাম না হয়ে থাকে, টিকা না নিয়ে থাকেন বা টিকাদান সম্পর্কে নিশ্চিত না হন তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শে অন্তত একটি এমএমআর টিকা নেওয়া উচিত। বিশেষ করে সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার সম্ভবনা থাকলে বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভ্রমণের আগে বুস্টার ডোজ বা কমপক্ষে একটি ডোজ এমএমআর টিকা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
* হামের টিকা একটি ‘লাইভ ভ্যাকসিন’, তাই টিকা নেওয়ার আগে নিজের স্বাস্থ্য অবস্থা চিকিৎসককে জানানো জরুরি।
১২. হামের টিকা নিলে মারাত্মক কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় কিনা?
না। হামের টিকা (এমআর/এমএমআর) নেওয়ার পর কিছু হালকা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে, যা সাধারণত স্বাভাবিক এবং সাময়িক।
* হালকা জ্বর
* ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা বা লালচে হওয়া
* হালকা র্যাশ (ফুসকুড়ি)
* সামান্য দুর্বলতা বা অস্বস্তি।
এগুলো সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যেই নিজে থেকেই সেরে যায়। গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই বিরল। টিকার উপকারিতা এই সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তুলনায় অনেক বেশি।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, শিশু বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ
বাংলাদেশ সময়: ১৯:২৯:২৪ ৩৬ বার পঠিত