
॥ এস এম রাজীব হোসাইন ॥
বাংলাদেশের অর্থনীতি এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জ্বালানি ঘাটতি, বাড়তে থাকা মুদ্রাস্ফীতি এবং লাগামহীন আমদানি ব্যয় এই তিনটি চাপ একসঙ্গে অর্থনীতিকে ক্রমেই সংকুচিত করে তুলছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট, এই পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে
তুলেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই ত্রিমুখী সংকট কতটা সামাল দিতে পারবে বাংলাদেশ? বাংলাদেশের জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরেই আমদানিনির্ভর। বছরে প্রায় এক হাজার কোটি ডলারের জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল একটি অর্থনীতি বৈশ্বিক বাজারের সামান্য ধাক্কাতেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে বর্তমান পরিস্থিতি তারই প্রমাণ। মার্চ মাসে পরিকল্পিত ডিজেল আমদানির একটি বড় অংশ বাতিল হওয়া এবং জ্বালানি বহনকারী জাহাজ সময়মতো না পৌঁছানো সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামকে ১১০ ডলারের ওপরে ঠেলে দিয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহে এই অনিশ্চয়তা সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল পাম্পে সংকটের চিত্র দেখা যাচ্ছে। যদিও সরকার আশ্বস্ত করছে যে পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে বড় ধরনের সংকট এড়ানো সম্ভব, বাস্তবতা বলছে বাজারে চাপ বাড়ছে। এই চাপ শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত সব মিলিয়ে এটি একটি চেইন রিঅ্যাকশনে রূপ নিচ্ছে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিফলন হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি। দেশে ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব পড়ে কৃষি, শিল্প এবং সেবাখাতে।
পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে, উৎপাদন ব্যয় বাড়লে বাজারে তার প্রতিফলন ঘটে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে যে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে, তা এই জ্বালানি সংকটেরই প্রতিফলন।
অন্যদিকে, এই সংকট মোকাবিলায় সরকার বৈদেশিক ঋণের দিকে ঝুঁকছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ ও বাজেট সহায়তার আশ্বাস পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এই ঋণ স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। বৈদেশিক ঋণ বাড়লে ডলার পরিশোধের দায় বাড়ে, যা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করে।
রিজার্ভ কমে গেলে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যায়, ফলে আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যায়। এটি একটি দুষ্টচক্রের সৃষ্টি করে যেখানে জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণ নেওয়া হচ্ছে, আবার সেই ঋণের চাপই আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপরও চাপ বাড়ছে। সুদের হার বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিলে তা বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আরও শ্লথ করে দিতে পারে।
এদিকে অর্থনীতির ভেতরকার দুর্বলতাগুলোও এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। বিনিয়োগের স্থবিরতা, রপ্তানি আয়ের ধীরগতি, ব্যাংক খাতের অনিশ্চয়তা এবং কম রাজস্ব আহরণ সব মিলিয়ে অর্থনীতি আগেই চাপে ছিল। কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনি¤œ হওয়ায় সরকারের আর্থিক সক্ষমতাও সীমিত। এই অবস্থায় জ্বালানি সংকট যেন বিদ্যমান সমস্যাগুলোর ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হলে ঝুঁকি বাড়বে বহুগুণে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে তেলের দাম ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বড় ধাক্কা হবে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহকে আরও সংকুচিত করবে।
এ অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ভারসাম্য রক্ষা করা। একদিকে জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে বিকল্প পথ খুঁজতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বল্পসুদে ঋণ সংগ্রহ, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানির দিকে নজর দেওয়াই হতে পারে টেকসই সমাধান।
সবশেষে বলা যায়, জ্বালানি ঘাটতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং আমদানি ব্যয়ের এই ত্রিমুখী চাপ শুধু একটি সাময়িক সংকট নয়; এটি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব, তবে তার জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত নীতি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে এই চাপ ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।যদিও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদী যে কোন পদক্ষেপই বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জটিল ও কঠিন।
##
লেখক: এস এম রাজীব হোসাইন
এম এস এস (মার্ষ্টাস) অর্থনীতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বাংলাদেশ সময়: ১৩:১৫:৪৪ ২০৪ বার পঠিত