
।। মুহাম্মদ শওকাত হোসেন ।।
ইসলাম ও মানবতার শত্রু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলীদের যৌথ হামলায় মুসলিম বিশ্বের অভিভাবক ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলী খামেনী শাহাদাত বরণ করেছেন। তাঁর শাহাদাতের সংবাদ শুনে একান্ত আপনজন হারানোর বেদনা অনুভব করছি। আজ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি শহীদ হযরত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (রহ.)কে। এই মহান ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আমার কিছু স্মৃতি রয়েছে আজকের এই বেদনার দিনে তা আমি আমার পাঠক ও বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করলাম।
শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনীর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় ১৯৮৩ সালে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শক্তির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করছি। ইরান বিপ্লবের শুরু থেকেই আমরা এবং আমাদের মূল দল ইসলামিক ডেমোক্রেটি লীগ (আইডিএল) ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে সমর্থন জানিয়েছিল। আমাদের চেয়ারম্যান মরহুম মাওলানা মোঃ আব্দুর রহীম সেক্রেটারি জেনারেল মরহুম মাওলানা আব্দুস সোবহান সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মরহুম ব্যারিস্টার কোরবান আলী ইরান সফর করে এসে এই বিপ্লবকে সমর্থন জানানোর কথা ঘোষণা করেছিলেন। তখনকার বাংলাদেশের আলেমদের সবচেয়ে মুরুব্বী মরহুম হযরত মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফিজজী হুজুর, মরহুম শাইখুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হকসহ অনেক ওলামা এ কেরাম ওই বছরই ইরান সফর করে ইরানের বিপ্লবকে ইসলামী বিপ্লব হিসেবে সমর্থন জানিয়েছিলেন।
১৯৮৩ সালের আগস্ট মাসে ইরানের রাজধানী তেহরানে আন্তর্জাতিক ইসলামী ছাত্র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে ইসলামী যুব শিবিরপন্থী ছাত্রশিবিরের চারজন এবং ইসলামী ছাত্র-ছাত্রী পক্ষ থেকে চারজন অংশগ্রহণ করেছিল। আমি ইসলামী ছাত্র শক্তির খুব গ্রুপ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম।
এই ছাত্র সম্মেলনের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেছিলেন তখনকার ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়েদ আলী খামেনী। তেহরানের হায়াতুল্লাহ তালেগানী সড়কের ফাইভ স্টার হোটেল ইন ক্লাবে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বলেছিলেন বিশ্বব্যাপী মুসলিম ঐক্যের কথা শিয়া সুন্নিদের ঐক্যের কথা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার কথা। তিনি বলেছিলেন ইরানে যেহেতু অধিকাংশ শসিয়া সেখানে সে আমার ভাব অনুযায়ী ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত ও পুরো পরিচালিত হচ্ছে। যেসব দেশে অধিকাংশ সুন্নি সেখানে অবশ্যই সুন্নী মাহজাব অনুযায়ী ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত অপরিচালিত হবে। তিনি এ ব্যাপারে ছাত্র সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। আমরা এই সম্মেলনে সামনের সারিতে বসে তার বক্তব্য শ্রবণ করেছিলাম।
১০ দিনের সম্মেলনের একদিন ছিল রাষ্ট্রপতি হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়েদ আলী খামিনির সঙ্গে সাক্ষাৎকার। তার অফিসে গিয়ে দেখেছিলাম নিচ তলায় ফ্লোরে বসে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। পরে তিনি আমাদের সঙ্গে অডিটোরিয়ামে মিলিত হন এবং আমাদের উদ্দেশ্যে আবারো বক্তব্য পেশ করেন। ঐদিন দুপুরে তিনি আমাদেরকে মেহমানদারী করিয়েছিলেন। এর দুদিন পরই ছিল শুক্রবার। আমাদের গাইড এসে জানালেন যে সকাল দশটায় জুমার জামাতে যেতে হবে। কিছুটা অবাক হয়ে কি হবে দশটায় গিয়ে দেখার জন্য তার সঙ্গে আমরা জুমার নামাজে গেলাম। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর তোমার জামাতে ইমামতি করেন রাষ্ট্রপতি সংসদের স্পিকার অথবা রাহবার কর্তৃক মনোনীত কোন বিজ্ঞ আয়াতুল্লাহ। আমরা এক মাসের বেশি সময় ইরানে ছিলাম। এরমধ্যে তেহরানে তিনটি জুমার নামাজ আদায় করেছিলাম। একটিতে ইমাম ছিলেন প্রেসিডেন্ট হুজ্জাতুল ইসলাম আলী খামেনী। দ্বিতীয় ইমামতি করেছিলেন স্পিকার হুজ্জাতুল ইসলাম রাফসান জানি এবং শেষ জুমায়ে ইমামতি করেছিলেন ইমাম খোমেনীর প্রতিনিধি আয়াতুল্লা জান্নাতি।
আমাদের অর্থাৎ বিদেশী মেহমানদের জন্য ইমামের সামনেই একটা বিশেষ জায়গা নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল। আমরা সেখানে বসে ছিলাম খুব কাছ থেকে ইমামকে দেখেছি। তিনি দীর্ঘ সোয়া দুই ঘন্টা একটানা বক্তব্য রেখেছিলেন অর্থাৎ জুমার খুতবা দিয়েছিলেন। আমাদের গাই ড আমাদের পাশে বসে তার খুতবার সার অংশ গুলো ইংরেজদের অনুবাদ করে আমাদেরকে শুনিয়েছে। তোমার খুতবা তিনি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের উপর বিভিন্ন নির্যাতন-নিপীড়নের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন মুসলমানদের সমস্যা ও সম্ভাবনার উপরে বক্তব্য রেখেছিলেন। এমনকি ভারতের আসামে মুসলমানদেরকে হত্যা করা হয়েছিল সেই হত্যার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। লক্ষ লক্ষ জনগণ সেই জুমার নামাজের সঠিক হয়েছিল। পেরান বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদকে কেন্দ্র করে মাইলের পর মাইল এলাকা নিয়ে সমস্ত রাস্তা ঘাটে তেহরানের সকল মুসলমানরা জুমায়ে শরিক হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ইমামের বক্তব্য শুনেছেন। মাঝেমধ্যে তারা শ্লোগান দিয়েছেন। আমেরিকা ইসরাইল এবং সাদ্দামের বিরুদ্ধে ¯ে¬াগান দিয়েছেন। আমরাও অবাক বিস্ময়ে সেই দৃশ্য অবলোকন করেছি। এরপরে ১৯৮৯ সালে ইমাম আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনীর ইন্তেকালের পরে ইমাম কর্তৃক মনোনীত হিসেবে সৈয়দ আলী খামেনী ইরানের রাহবার তথা সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে মনোনীত হন। এই ঘটনার ৩২ বছর পরে বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুবার্ষিকীতে ২০১৬ সালে আমি পুনরায় ইরান সফর করার সৌভাগ্য অর্জন করি। সেবার বিপ্লবের নেতা ইমাম আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠানটি হয়েছিল আয়াত খোমেনীর মাজার সংলগ্ন চত্বরে। সেখানে লাখো জনতার সঙ্গে আমরা সে অনুষ্ঠান উপভোগ করি। যদিও বিদেশি মেহমান হিসেবে আমাদেরকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে সকলের সামনে বসার জায়গা করে দেওয়া হয়েছিল। সেবারও বিপ্লবের নেতার সঙ্গে আমাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা হয়েছিল।
শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনী রাহমাতুল্লাহ আলাইহি এর শাহাদাত বরনের খবরটি শুনে আমার শোক আসন্ন মনে সেই সব স্মৃতিগুলো ভেসে উঠছে। তিনি প্রায় সময়ই শাহাদাতের তামান্না ব্যক্ত করতেন। মহান আল্লাহ তার সেই কামনাকে মঞ্জুর করে তাকে শহীদ হিসেবে কবুল করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন। ইরান অতীতের ন্যায় এবারের সুখ ও শক্তিতে পরিণত করে ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে এবং ইসলামের শত্রুদেরকে পরাজিত করতে সক্ষম হবে এটাই আজকের দিনে মহান আল্লাহ তাআলার কাছে কামনা করছি।
বাংলাদেশ সময়: ১২:৫২:৫০ ৭৭ বার পঠিত