
বিশেষ প্রতিনিধি ॥
ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ার প্রতীক নিয়ে ভোলা-১ (সদর) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোহাম্মদ আশ্রাফ আলী। রাজনীতি বা ভোটের মাঠ কোথাও পরিচিতি নেই তাঁর। এই প্রার্থীর পক্ষে প্রচারও দেখা যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আশ্রাফ আলী ইলিশা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। ভোলার চারটি আসনে ২৯ প্রার্থীর মধ্যে তাঁর মতো নিষ্ক্রিয় প্রার্থী সংখ্যা ১৭।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোলা-১ (সদর) আসনে প্রার্থী ৮ জন, ভোলা-২ (দৌলতখান-বোরহানউদ্দিন) আসনে ৮, ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) আসনে ৬ ও ভোলা-৪ (চরফ্যাসন-মনপুরা) আসনে ৭ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে ১৭ জন প্রার্থীর পক্ষে প্রচার নেই।
দৌলতখানের চরখলিফার বাসিন্দা মজিবর রহমান বলেন, ‘কেন তারা (প্রচারবিহীন প্রার্থী) নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন, কী কারণেই বা তারা প্রচার চালাচ্ছেন না- কিছুই সাধারণ মানুষ জানে না। ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারের সমান পরিচয় নেই, এমন লোকও এমপি পদে নির্বাচন করছেন।’
নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরও মানুষ তাদের ‘এমপি’ বলবে এ আশায় তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এমন মত শিক্ষক আনোয়ার পারভেজের।
তবে তজুমদ্দিনের সম্ভুপুরের বাসিন্দা জুয়েল সরকারের ভাষ্য, কিছু প্রার্থী প্রভাবশালী প্রার্থীর কাছে এজেন্ট বিক্রির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এক্ষেত্রে তিনি ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. কামাল উদ্দিনকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য, জাতীয় পার্টির হয়ে এই নেতা গত দ্বাদশ নির্বাচনেও প্রার্থী হয়েছিলেন। তিনি মূলত প্রভাবশালী এক প্রার্থীর ডামি হয়েছিলেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. কামাল উদ্দিনের নম্বরে দফায় দফায় কল দিলেও ধরেননি। মোহাম্মদ আশ্রাফ আলী যে আসনের প্রার্থী, সেই ভোলা-১ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলেছে জামায়াতে ইসলামীর অধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলামের। এখানে আরও আছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা মো. ওবায়দুর রহমান ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) মো. মিজানুর রহমান। মূলত এই চার প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নির্বাচনী মাঠ সরগরম। অন্য কাউকেই মাঠে দেখা যায়নি। নির্বাচনী এলাকায় তাদের ব্যানার বা বিলবোর্ডও চোখে পড়েনি।
জাতীয় পার্টির লাঙ্গল নিয়ে এখানে লড়ছেন মো. আকবর হোসাইন। অথচ তাঁর নির্বাচন কর্মকান্ড চোখেই পড়ে না। একই অবস্থা গণঅধিকার পরিষদের (ট্রাক) মো. আইনুর রহমান জুয়েল মিয়া ও স্বতন্ত্র প্রার্থী রফিজুল হোসেনের (সূর্যমুখী)। কাগজপত্রে প্রার্থী হলেও মাঠে তাদের দেখা নেই। আকবর হোসাইনের দাবি, তিনি প্রচার চালাচ্ছেন। আইনুর রহমান জুয়েল মিয়ার ভাষ্য, তিনি একাই প্রচার-প্রচারণা করছেন। এখনও কোনো ব্যানার বা লিফলেট তৈরি করেননি। প্রচার মাইকও নেই মাঠে। তিনি নির্বাচনী পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছেন।
ভোলা-২ আসনের মাঠ গরম করে রেখেছেন বিএনপি প্রার্থী হাফিজ ইব্রাহিম ও জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা ফজলুল করিম। ইতোমধ্যে এলডিপি প্রার্থী মোকফার উদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতে ইসলামের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে। অন্য প্রার্থীরা হলেন জাতীয় পার্টির মো. জাহাঙ্গীর আলম রিটু (লাঙ্গল), আমজনতার দলের মো. আলাউদ্দিন (প্রজাপতি) এবং তিন স্বতন্ত্র প্রার্থী তাছলিমা বেগম (ফুটবল), মহিবুল্যাহ খোকন (হাঁস) ও মো. জাকির হোসেন খন্দকার (মোটরসাইকেল)। তাদের কারও পক্ষেই প্রচার-প্রচারণা নেই।
পেশায় আইনজীবীর সহকারী (মুহুরি) তাছলিমা বেগম দৌলতখানের উত্তর জয়নগর ইউপির সাবেক সংরক্ষিত নারী সদস্য। তাঁর ভাষ্য, ফুটবল প্রতীকের পক্ষে একাই প্রচার করছেন। জনবল না থাকায় সব নিজেকেই সামলাতে হচ্ছে। অসহায় সাধারণ মানুষের জন্য প্রার্থী হয়েছেন। বেশ সাড়া পাচ্ছেন। নির্বাচিত হলে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠন করতে চান।
ভোলা-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। এ ছাড়া আছেন জামায়াতে ইসলামী জোটের সমর্থিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) প্রার্থী মুহা. নিজামুল হক নাঈম ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা মো. মোসলেহ উদ্দিন। প্রবীণ-নবীন এই তিন প্রার্থীই দিনরাত গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটছেন।
এ আসনের বাকি তিন প্রার্থীর ঘুম ভাঙেনি এখনও। নির্বাচনী এলাকায় তাদের ব্যানার-বিলবোর্ডও নেই। লালমোহনের গজারিয়ার বাসিন্দা রফিজুল হকের মতে, এই প্রার্থীরা নাম জাহির করতে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। এলাকায়ও পরিচিতি নেই, এমপি হওয়ার যোগ্যতাও নেই।
ভোলা-৪ আসনে লড়ছেন বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবুল মোকাররম মো. কামাল উদ্দিন। তারা প্রতীক নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। অন্য চার প্রার্থী মাঠে নিষ্ক্রিয়। তারা হলেন জাতীয় পার্টির মো. মিজানুর রহমান (লাঙ্গল), জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) আবুল কালাম (সিংহ), আমজনতার দলের মো. জালাল উদ্দিন রুমী (প্রজাপতি) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম (ফুটবল)।
এই আসনের দুই-তিনজন প্রার্থী ছাড়া অন্যদের নামই শোনেননি বলে মন্তব্য করেন চরফ্যাসনের হাসানগঞ্জের প্রবীণ নারী জাহানারা। তিনি বলেন, এলাকায়ও তাদের পরিচিতি নেই, তাই আলোচনাও নেই। ভোটের আগেই সবাই বুঝে গেছেন, তারা নামমাত্র প্রার্থী।
চারটি আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা লড়ছেন লাঙ্গল প্রতীকে। তাদের ঢিলেঢালা প্রচারের বিষয়ে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) ভোলা জেলার আহ্বায়ক মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, অসুস্থতার কারণে তিনি ঢাকায়। তবে প্রার্থীরা নিজেদের মতো করে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
জনবিচ্ছিন্ন এসব প্রার্থীকে নিয়ে ভিন্ন মন্তব্য করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ভোলা জেলার সভাপতি মোবাশ্বির উল্যাহ চৌধুরী। তাঁর মতে, নামসর্বস্ব দলগুলোর কার্যক্রম বাঁচিয়ে রাখা ও অন্য দলের হয়ে এজেন্ট ভাড়া দিতেই কিছু প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। মোবাশ্বির উল্যাহ চৌধুরী বলেন, বিশেষ বিশেষ দল সারা বাংলাদেশে তাদের প্রার্থী আছে বোঝাতে টাকা দিয়ে প্রার্থী করে। তারা রাজনীতি করেও না, দল স¤পর্কে ধারণা নাই। এ ছাড়া কিছু রাজনৈতিক দল ভোটকেন্দ্রে এজেন্ট নিয়োগ করার জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করে রাখে। তারা নিজের দলের বদলে অন্য দলের (ভাড়ায়) কাজ করে।
বাংলাদেশ সময়: ০:৫৮:০৩ ১৫৪ বার পঠিত