ভোলার সম্ভাবনা কবে কাজে লাগবে

প্রচ্ছদ » অপরাধ » ভোলার সম্ভাবনা কবে কাজে লাগবে
সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬



---

।। শতরূপা দে ।।

গত বছরের আগস্ট মাসে ভোলাকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে বড় সংবাদ। অর্থনৈতিক অঞ্চল মানে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি। কিন্তু ভোলার মানুষের কাছে এই ঘোষণা খুব একটা নতুন নয়। কারণ ভোলা বহু বছর ধরেই সম্ভাবনার জেলা হিসেবে পরিচিত। বাস্তবে সেই সম্ভাবনার বাস্তবায়ন তারা খুব কমই দেখেছে। তাই ভোলার ক্ষেত্রে ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নের সদিচ্ছা, নীতিগত সাহস এবং প্রশাসনিক দক্ষতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভোলা এমন একটি জেলা, যেখানে সম্ভাবনার কখনও অভাব ছিল না। অভাব ছিল সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আন্তরিকতায়। এই জেলার ইতিহাস এখন সম্ভাবনা আর অবহেলার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প।

১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ভোলার ইতিহাসে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন রেখে গেছে। পুরো জেলা পানিতে ডুবে গিয়েছিল। সরকারি হিসাবে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়, যা শুধু ভোলার নয়, মানব সভ্যতার ইতিহাসেও একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। উপকূলীয় জেলা হওয়ায় ভোলা আজও ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও বন্যার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে। এই ভোলাই আবার দেশের জ্বালানি খাতের জন্য এক বড় আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে, যা এক ধরনের নির্মম বৈপরীত্যও বটে।

ভোলায় আছে গ্যাস, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা, নদীপথ, বিস্তীর্ণ জমি এবং কর্মক্ষম জনবল। সবচেয়ে বড় কথা, আছে প্রাকৃতিক সম্পদের এমন এক সমন্বয়, যা যে কোনো জেলাকে শিল্প ও জ্বালানির কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। ভোলার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর গ্যাস, যা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এখন পর্যন্ত ভোলায় তিনটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে– শাহবাজপুর, ভোলা নর্থ ও ইলিশা। প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী এসব গ্যাসক্ষেত্রে সম্ভাব্য গ্যাস মজুত প্রায় সোয়া দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট। ৯টি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে উত্তোলন হচ্ছে মাত্র ৭০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। অর্থাৎ গ্যাসের ঘাটতি নেই; ঘাটতি আছে সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব ও প্রশাসনিক অনিয়মের কারণে এই মহামূল্যবান স¤পদ আজও মাটির নিচে বন্দি।

ভোলার ৩৩ মেগাওয়াট রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের অক্ষমতা বা গ্যাসের অভাবে নয়, বরং বিল বকেয়ার কারণে। বিতরণকারী সংস্থার পাওনা পরিশোধ না হওয়ায় একটি গ্যাসসমৃদ্ধ জেলায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অচল হয়ে আছে। একদিকে নিজেদের স¤পদ অব্যবহৃত, অন্যদিকে আমরা উচ্চমূল্যে বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছি। এই বৈপরীত্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতারও প্রতীক।

পত্রিকা, টেলিভিশন ও সামাজিক মাধ্যম খুললে প্রায়ই চোখে পড়ে, বিদেশি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কো¤পানি বকেয়া না পাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে; কোনো আমদানিনির্ভর প্লান্ট বন্ধ হয়ে গেছে; কোথাও আবার লোডশেডিং বেড়েছে। এসব খবর এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার একটি নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা কি সত্যিই এতটা অসহায় যে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে বারবার অন্য দেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে?

বাস্তবতা হলো, নিজের দেশের প্রাকৃতিক স¤পদকে পরিকল্পিত ও সুশাসিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ অনেকটাই স্বয়ংস¤পূর্ণ হতে পারে। ভোলার মতো জেলায় যেখানে গ্যাস আছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে, অথচ সেখানকার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু বকেয়ার কারণে বন্ধ পড়ে থাকে; সেখানে বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ আমদানি করা শুধু অর্থনৈতিক বোঝা নয়, নীতিগত ব্যর্থতারও প্রকাশ।

বাস্তব শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ভোলায় ইতিবাচক কিছু চিহ্নও দেখা যাচ্ছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ হাজার বিঘা জমিতে শিল্প পার্ক গড়ছে। শেল্টেক্ সিরামিক কারখানা চালু করেছে। ঊর্মি গ্রুপ সিনথেটিক ও ম্যান-মেইড ফাইবার কারখানা স্থাপন করছে। সরকার সার কারখানা ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কথা বলছে। এসব উদ্যোগ ভোলাকে শিল্পকেন্দ্র বানানোর বাস্তব সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে হলে আস্থার জায়গা তৈরি করতে হয়। শিল্পের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। যদি একটি ৩৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু বকেয়ার কারণে বছরের পর বছর বন্ধ থাকে, তাহলে বড় বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারায়।

জাতীয় জ্বালানিনীতির দিক থেকেও ভোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন এলএনজি, কয়লা ও বিদ্যুৎ আমদানিতে বিপুল ডলার ব্যয় করছি, তখন নিজেদের গ্যাসক্ষেত্র অর্ধেক সক্ষমতায় পড়ে থাকা এক ধরনের স্ববিরোধিতা। ভোলার গ্যাস শুধু ভোলার নয়, এটি পুরো দেশের সম্পদ। এই গ্যাস দিয়েই বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব। এই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে হলে ভোলাকে মূল ভূখ-ের সঙ্গে বাস্তব অর্থে যুক্ত করতে হবে। ভোলা-বরিশাল সেতু শুধু যাতায়াত বা আঞ্চলিক আবেগের প্রশ্ন নয়; এটি ভোলাকে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক জোনে রূপ দেওয়ার প্রধান শর্ত। সেতু হলে পরিবহন সহজ হবে, সময় ও খরচ কমবে, বিনিয়োগের ঝুঁকি কমবে। ভোলা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের তকমা থেকে বের হয়ে জাতীয় অর্থনীতির মূল স্রোতে যুক্ত হবে।

শতরূপা দে: যোগাযোগবিদ

বাংলাদেশ সময়: ২০:৩৪:০৩   ১৮৫ বার পঠিত  







পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

অপরাধ’র আরও খবর


চরফ্যাশনে ছেলের সাথে মাদক নিয়ে দ্বন্দ্বে পিতাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ
বোরহানউদ্দিনে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা: একাধিক হামলার অভিযোগ
ভেদুরিয়ায় গরুর গাড়িতে ভোট দেওয়ায় ব্যবসায়িকে পিটিয়ে গুরুতর আহত
শিবপুরে হাতপাখা কর্মীদের উপর, আহত-১০
ভোলায় খরের গাদায় দুর্বৃত্তের আগুন, ২৫লাখ টাকার ক্ষতি
মনপুরায় পলাতক এক মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার
ভেলুমিয়ায় ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াত ইসলামীর কর্মীদের মারামারি, আহত ৪
মনপুরায় বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে আহত-৮
মনপুরায় ভুয়া এমবিবিএস চিকিৎসক আটক, থানায় মামলা দায়ের
ভোলায় কোস্ট গার্ডের অভিযান, আটক ২



আর্কাইভ