
ইব্রাহিম আকতার আকাশ ॥
নদীঘেরা দ্বীপ জেলা ভোলা। চারপাশে নদী, খাল, পুকুর আর জলাশয়। যেখানে একদিকে যেমন জীবনের গতি, অন্যদিকে তেমনি প্রতিদিন লুকিয়ে থাকে মৃত্যুর ফাঁদ। বিশেষ করে শিশুদের জন্য পানি এখানে আতঙ্কের নাম। প্রতিবছর পানিতে ডুবে শত শত শিশু প্রাণ হারায়। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় বরিশাল বিভাগে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার প্রায় দ্বিগুণ, আর সেই তালিকায় ভোলা অন্যতম। এই ভয়াবহ বাস্তবতার মাঝেই এক তরুণের হাত ধরে জন্ম নিচ্ছে আশার আলো।
চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি ভোলার মনপুরা উপজেলার একটি পুকুরে পানিতে ডুবে মারা যায় দুই বছর বয়সী শিশু আরিশা। শুধু তাই নয়- এর আগেও একই পরিবারের দুই শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছিল। একই পরিবারের তিন শিশুর এমন করুণ মৃত্যু যেন পুরো গ্রামকেই শোকস্তব্ধ করে দেয়।
কিন্তু সেই শোকই একদিন রূপ নেয় শক্তিতে। সেই পরিবারেরই এক তরুণ তাহসিন। শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর এই মর্মান্তিক অধ্যায় থামাতে নেমে পড়েন এক নতুন অভিযানে।
তাহসিনের আবিষ্কৃত ডিভাইসটির নাম “চাইল্ড সেফটি ডিভাইস”। দেখতে ছোট একটি লকেটের মতো, ওজন মাত্র ২ গ্রাম। এটি শিশুর গলায় ঝুলিয়ে রাখা যাবে।
শিশু যদি অসাবধানতাবশত পানিতে পড়ে যায়। তাহলে সঙ্গে সঙ্গে বাজবে সাইরেন। শিশুর অভিভাবকের মোবাইলে যাবে কল। দেখা যাবে শিশুটি কোন জায়গায় পানিতে পড়েছে তার লোকেশনও। ফলে মুহূর্তের মধ্যেই উদ্ধার করে শিশুর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে।
তাহসিন জানান, ডিভাইসটি পানির সংস্পর্শে এলেই পানিতে থাকা মুক্ত ইলেকট্রন সুইচের মতো কাজ করে। সঙ্গে সঙ্গে সিগনাল চলে যায় ঘরে থাকা রিসিভারে। রিসিভার বাজিয়ে দেয় সাইরেন, একই সঙ্গে অভিভাবকের ফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কল যায়। চাইলে জিপিএসের মাধ্যমে শিশুর অবস্থানও জানা যায়।
তাহসিন ভোলার মনপুরা উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের সোনার চর গ্রামের ক্বারী আব্দুল হালিম মিয়ার ছেলে। তিনি বর্তমানে ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি কলেজের দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্র।
তার বাবা ক্বারী আব্দুল হালিম একজন মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই বাবার উৎসাহ ও সহায়তায় ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে নানা গবেষণায় যুক্ত ছিলেন তাহসিন।
তাহসিন বলেন, “আমার দুই খালাতো বোন পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার পর বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। আমি তখনই ভাবি এই মৃত্যুগুলো কি থামানো যায় না? সেই প্রশ্ন থেকেই গবেষণা শুরু করি। প্রায় ৮ থেকে ৯ মাস পর এই ডিভাইসটি তৈরি করতে সক্ষম হই।”
তিনি আরো জানান, ডিভাইসটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। তবে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করলে দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যেই বাজারে আনা সম্ভব।
তাহসিনের বাবা ক্বারী আব্দুল হালিম বলেন, “আমার ছেলে ছোটবেলা থেকেই ইলেকট্রনিক্স নিয়ে কাজ করে। আজ সে এমন একটি ডিভাইস বানিয়েছে যা হাজারো শিশুর প্রাণ বাঁচাতে পারে। সরকারের সহায়তা পেলে এটি সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।”
ভোলা জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. শামীম রহমান বলেন, “তাহসিনের এই উদ্ভাবন সত্যিই প্রশংসনীয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার পাশে আমরা থাকব।”
ভোলা সিভিল সার্জন ডা. মনিরুল ইসলাম বলেন, “একটি ছোট ডিভাইসে শিশুর প্রাণ রক্ষা এটা সত্যিই অভাবনীয়। এটিকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।”
ইতোমধ্যে তাহসিনের তৈরি ১৫টি প্রজেক্ট দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার।
ভোলার জলভরা এই ভূখ-ে যখন শিশুরা মৃত্যুর ঝুঁকিতে, তখন তাহসিনের “চাইল্ড সেফটি ডিভাইস” হয়ে উঠতে পারে হাজারো পরিবারের আশার আলো। শোকের বুক চিরে জন্ম নেওয়া এই আবিষ্কার বদলে দিতে পারে শিশু মৃত্যুর নির্মম গল্প।
বাংলাদেশ সময়: ০:৪৫:৫৯ ১০৮ বার পঠিত