
।। মোঃ বিল্লাল হোসেন জুয়েল ।।
মানবিক রাষ্ট্রের মূল কেন্দ্রবিন্দু মানুষ। মানুষের জীবন, মর্যাদা, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতা-এই পাঁচটি উপাদানই মানবিকের ভিত্তি গড়ে দেয়। রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি যতই উন্নত হোক না কেন, যদি মানুষের মৌলিক অধিকার ও ভোক্তার অধিকার সুরক্ষিত না থাকে, তবে রাষ্ট্রকে মানবিক বলা যায় না। অতএব, মানবাধিকার ও ভোক্তা অধিকার- দুটিই একটি রাষ্ট্রের মানবিক চরিত্র নির্মাণে একে অপরের পরিপূরক।
মানবাধিকার ধারণাটি আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এবং প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার হিসেবে গণ্য হয়। এটা কোন ধরণের করুণা নয়। জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালে মানবাধিকারকে প্রথমবারের মতো স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে বৈশ্বিক পরিসরে মানবাধিকার রক্ষার একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।
মানুষের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়ে বলা হয়, প্রতিটি মানুষ কেবল মানুষ হওয়ার কারণে কিছু মৌলিক অধিকারের অধিকারী- যার মধ্যে রয়েছে জীবন ও স্বাধীনতা, মতপ্রকাশ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা। রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্বই হলো এই অধিকারগুলোকে সুরক্ষিত করা এবং লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিকার নিশ্চিত করা।
অর্থনীতির ভাষায়, একটি উৎপাদিত পণ্য বা সেবা চূড়ান্ত বা প্রান্তিক ভোগের উদ্দেশ্যে যিনি ক্রয় করে থাকেন তাকে ভোক্তা বা ক্রেতা বলা হয়। ভোক্তা অধিকার তুলনামূলকভাবে আধুনিক ধারণা হলেও এটি আজ মানবাধিকার সুরক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাজারে প্রতারণা, অতিরিক্ত দাম, ভেজাল খাদ্য, নকল ওষুধ, ভুল ওজন বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই ঘটায় না; বরং মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদাকে হুমকির মুখে ফেলে।
মানবিক রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার ও ভোক্তা অধিকার দুটিই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মানবাধিকার যেখানে মানুষের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, সেখানে ভোক্তা অধিকার মানুষের নিরাপদ জীবনযাপন নিশ্চিত করে। মানবাধিকার নিশ্চিত না হলে সমাজে ন্যায়বিচার থাকে না; আর ভোক্তা অধিকার সুরক্ষিত না হলে সমাজে ন্যায্যতা ও নিরাপত্তা নষ্ট হয়। তাই একটি মানবিক রাষ্ট্রে দুটি অধিকারেরই বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশে মানবাধিকার ও ভোক্তা অধিকার- দুটির বাস্তবায়নে অগ্রগতি থাকলেও অনেক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। মানবাধিকার রক্ষায় বিচারব্যবস্থার জটিলতা, দারিদ্র্য ও নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা, মতপ্রকাশে বাধা, এবং সচেতনতার অভাব এখনও প্রধান অন্তরায়। একইভাবে ভোক্তা অধিকারের ক্ষেত্রে নকল পণ্যের আধিপত্য, খাদ্যে ভেজাল, বাজার সিন্ডিকেট, অনলাইন প্রতারণা, মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং জনসচেতনতার ঘাটতি বড় বাধা। এসব সমস্যা মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
তবে এসব চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব- যদি রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণ একযোগে দায়িত্ব পালন করে। মানবাধিকার রক্ষায় প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং নারী-শিশুসহ দুর্বল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা। অপরদিকে, ভোক্তা অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি ভিত্তিক বাজার মনিটরিং, ভেজালবিরোধী কঠোর অভিযান, অনলাইন ব্যবসায় কঠোর নীতিমালা, অভিযোগ ব্যবস্থাকে সহজ করা এবং ভোক্তা সচেতনতা বাড়ানো।
মানবিক রাষ্ট্র শুধু নীতিতে বা আইনে সীমাবদ্ধ নয়; এর বাস্তব রূপ দেখতে পাওয়া যায় নাগরিক জীবনের প্রতিটি স্তরে- বাজার, হাসপাতাল, বিদ্যালয়, রাস্তায়, অফিসে এবং বিচার ব্যবস্থায়। যখন মানুষ সম্মান পায়, ন্যায়বিচার পায়, নিরাপদ খাদ্য পায়, সঠিক মূল্য পায়, প্রতারণামুক্ত সেবা পায়-তখন রাষ্ট্র মানবিক হয়ে ওঠে। মানবিক রাষ্ট্রের ধারণা কাগজে নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়।
আজকের বিশ্বে উন্নত রাষ্ট্রগুলো মানবাধিকারের পাশাপাশি ভোক্তা অধিকারের ওপর জোর দিচ্ছে; কারণ তারা বুঝছে যে নিরাপদ খাদ্য, সঠিক দাম, মানসম্মত পণ্য এবং বাজারে স্বচ্ছতা মানুষের জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। একটি রাষ্ট্রে যখন ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়; তখন মানুষের মধ্যে আস্থা বাড়ে, প্রতারণা ও দুর্নীতি কমে এবং অর্থনীতি শক্তিশালী হয় আর যখন নাগরিকের অধিকার রক্ষা হয়, তখন রাষ্ট্র মানবিক রূপ পায়।
বাংলাদেশও সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে। মানবাধিকার কমিশন, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা- সবাই মিলে একটি অধিকতর মানবিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য কাজ করছে। যদিও কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জনে আরও সময় প্রয়োজন। জনগণের সচেতনতা বাড়ছে, ভোক্তারা অভিযোগ করতে শিখছে, বাজারে মনিটরিং বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং মিডিয়া ভোক্তা প্রতারণা উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০০৯ সালে সরকার “ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন” প্রণয়ন করে এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাজার তদারকি, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও ভোক্তার অভিযোগ গ্রহণের একটি কাঠামো তৈরি হয়।
মানুষ শুধু একটি রাজনৈতিক সত্তা নয়; সে একজন অর্থনৈতিক অংশীজনও । তার জীবনে বাজারের প্রভাব যেমন গভীর, তেমনি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যদি নিরাপদ না থাকে, মানসম্মত পণ্য না পায়, ভেজাল খাদ্যে অসুস্থ হয়, যদি প্রতারণায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়- তাহলে তার মানবাধিকার কখনোই পূর্ণতা পাবে না। তাই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথ বাজারের ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা দিয়েই শুরু হয়।
মানবিক রাষ্ট্রে মানবাধিকার ও ভোক্তা অধিকার পরস্পর সম্পূরক। মানবাধিকারের আলো মানুষের জীবনকে আলোকিত করে- আর ভোক্তা অধিকার সেই আলোর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করে বাজার, সমাজ ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। একটি সুশাসিত, নিরাপদ ও ন্যায্য সমাজ গড়তে উভয় অধিকারেই বাস্তবায়ন অপরিহার্য। রাষ্ট্র ও জনগণ মিলেই এই যাত্রা সফল করতে পারে- এবং মানবিক সমাজ গঠনের মূল চাবিকাঠি এখানেই নিহিত।
লেখক: মোঃ বিল্লাল হোসেন জুয়েল
সহকারী অ্যধাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সমাজকর্ম বিভাগ
বাংলাবাজার ফাতেমা খানম কলেজ, ভোলা।
বাংলাদেশ সময়: ১৩:১৬:০০ ৪০ বার পঠিত