
বিশেষ প্রতিনিধি ॥
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ভোলা-লক্ষ্মীপুর নৌরুট। অথচ নানা সমস্যায় জর্জরিত এ রুটের ইলিশা ফেরি ও লঞ্চঘাট। বৃষ্টি ও জোয়ার এলেই তলিয়ে যায় সংযোগ সড়ক। ঘাটটিতে গড়ে ওঠেনি টার্মিনাল, নেই পার্কিং ব্যবস্থা। রাস্তার ওপর রাখা হয় মালবোঝাই ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ অন্য যানবাহন। নেই বিশ্রামাগার, বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের ব্যবস্থা। এমনকি শৌচাগারও নেই জনগুরুত্বপূর্ণ এ ঘাটে। এসব কারণে এ রুটে চলাচলকারী কয়েকশ শ্রমিক ও যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
ইলিশা ঘাট ছাড়াও দ্বীপজেলা ভোলা থেকে দেশের মূল ভূখ-ের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিআইডব্লিউটিএর ২৪টি লঞ্চঘাট রয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি ঘাটে যাত্রীছাউনি, বিশ্রামাগারসহ অন্য সুযোগ-সুবিধা নেই।
দ্বীপ জেলা ভোলার প্রধান ও দক্ষিণাঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইলিশা লঞ্চঘাটে গত ১৫ বছরে ন্যূনতম যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে পারেনি বিআইডব্লিউটিএ। লঞ্চে ওঠানামার জন্য কয়টি পন্টুন স্থাপনের মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। পন্টুন থেকে নেমেই কাঁচা সংযোগ সড়ক। বর্ষাকালে কাদাপানিতে সড়ক পিচ্ছিল থাকে। শুকনা মৌসুমে ধুলাবালুতে একাকার।
গত শুক্রবার ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, কাদাপানির কারণে ফেরিঘাটের দুটি পন্টুনে ওঠানামায় যাত্রীদের সমস্যা হচ্ছে। সংযোগ সড়কে কাদায় যাত্রীরা পিছলে পড়ছেন। ফেরিতে ওঠার সড়ক ডুবে গেছে। লঞ্চঘাটে অবস্থা আরও খারাপ। দুপুরে সহস্রাধিক যাত্রী নিয়ে ভোলার ইলিশা ঘাটে ভেড়ে দোয়েল পাখি-৮ সহ দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চ। তখন ৩ থেকে ৫ ফুট পানিতে তলিয়ে ছিল তিনটি পন্টুন ও ফেরিতে ওঠানামার দুটি সংযোগ সড়ক। বাড়ি ফেরার তাড়ায় থাকা অনেক যাত্রীকে পিছলে পড়তে দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে পানি ভেঙেই লঞ্চ থেকে নামতে বাধ্য হন শত শত যাত্রী। প্রবল স্রোতের মধ্য দিয়ে নামতে গিয়ে নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধ যাত্রীদের নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে।
কথা হয় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঘাটে আসা কলেজ শিক্ষক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ঘাটে এলেই রাজ্যের ভোগান্তি পোহাতে হয়। সংযোগ সড়ক নেই। কাদামাটিতে একাকার যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাটে অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু কোনো যাত্রীছাউনি বা শৌচাগার নেই। নিজের তো বটেই। পরিবার নিয়ে এলে আরও ভোগান্তি পোহাতে হয়।
আক্ষেপ করে চট্টগ্রামগামী যাত্রী হুমায়ন কবির জানান, এ রুটের যাত্রীদের ভোগান্তি চলে ১২ মাস। বিশেষ করে, ঈদ উৎসবে দুর্ভোগ সীমা ছাড়িয়ে যায়। রোদ-বৃষ্টিতে খোলা জায়গায় নদীর তীরে ব্লকের ওপর অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। পন্টুনের কাছে কিছু অস্থায়ী দোকান থাকলেও বিপুল সংখ্যক যাত্রীর জন্য বিশ্রামাগার নেই।
পোশাকশ্রমিক মিনারা বেগম বলেন, কর্মস্থল চট্টগ্রামে যাব। সকালের সি-ট্রাক ধরতে পারিনি। পরে ঘাটে এসেছি। দুপুর ২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। টয়লেটে যেতে পারিনি। সন্তানকে দুধ পানের জন্য আড়াল কোনো জায়গা পাইনি। এমন ভোগান্তি আর কত দিন পোহাতে হবে?
বিআইডব্লিউটিসির তথ্যমতে, ইলিশা ঘাট থেকেই প্রতিদিন ঢাকা-ভোলা রুটে ১১টি ও ভোলা লক্ষ্মীপুর রুটে পাঁচটি নৌযানে যাত্রী পরিবহন করা হয়। এছাড়া ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুটে পাঁচটি ফেরি নিয়মিত চলছে। এতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করছেন এ রুটে। বিপুলসংখ্যক যাত্রীর জন্য নেই কোনো ছাত্রীছাউনি বা নিরাপদ বসার স্থান। বিশুদ্ধ পানি বা খাবারের সংকটও তীব্র। যাত্রীদের বিশ্রামের জন্য ২০২০ সালে বিআইডব্লিউটিএ ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করে একটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করেছিল। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেটি ব্যবহারের অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে আছে। এখন সেটি জঙ্গলে ঘেরা। মাদকসেবীরা সেখানে আসর জমায়। আধাপাকা এ বিশ্রামাগার নির্মাণেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক মোহাম্মদ সেলিম রেজা বলেন, ঘাটের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় শিগগিরই কাজ শুরু হবে।
বিআইডব্লিউটিএর ভোলা নদীবন্দর কর্মকর্তা রিয়াদ হোসেন জানিয়েছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ঘাটটি একাধিকবার পরিদর্শন করে গেছে। যাত্রীসেবা উন্নয়নে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ সময়: ১:০৭:১৫ ২২৮ বার পঠিত