দুই ভাইবোনের মর্মান্তিক মৃত্যু: চিরতরে বেদনার সমুদ্রে ডুবে গেলো পরিবার

প্রচ্ছদ » জেলা » দুই ভাইবোনের মর্মান্তিক মৃত্যু: চিরতরে বেদনার সমুদ্রে ডুবে গেলো পরিবার
বুধবার, ২৩ জুলাই ২০২৫



---

মো. বেল্লাল নাফিজ ॥

ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়িতে ঘটে যাওয়া হৃদয়বিদারক বিমান দুর্ঘটনায় জীবনপ্রদীপ নিভে গেলো দুই কোমলমতি ভাইবোনের। একদিকে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী, অন্যদিকে শিশু বয়সের উচ্ছ্বাসে ভরা দুটি প্রাণ সেই নাদিয়া ও নাফিজ আজ আর নেই। তাদের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, গোটা সমাজ ও জাতির জন্যও গভীর বেদনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

দৌলতখান উপজেলার দক্ষিণ জয়নগর ইউনিয়নের অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলামের মেয়ে তাহিয়া তাবাসসুম নাদিয়া (১৩) এবং ছোট ছেলে নাফিজ (৯) বিমান দুর্ঘটনায় দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়লেও শেষ রক্ষা হয়নি। বড় বোন নাদিয়া সোমবার দিবাগত রাত ৩টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর মঙ্গলবার (২২ জুলাই) দিবাগত রাতে ছোট ভাই নাফিজও না ফেরার দেশে চলে যায়।

পারিবারিক সূত্র জানায়, নাদিয়া মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ছিল। ছোট ভাই নাফিজ পড়তো তৃতীয় শ্রেণিতে। তাদের গ্রামীণ শিকড় দক্ষিণ জয়নগরের ৭নম্বর ওয়ার্ডের ‘আব্দুল অদুদ হাওলাদার বাড়ি’। পরিবারটি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে অবদান রাখার স্বপ্নে বিভোর ছিল।

ঘটনার সূত্রপাত উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত বিমান রাইডের একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে। সেসময় বিমান বিধ্বংসে আগুন লেগে শ্রেণী কক্ষে থাকা নাদিয়া ও নাফিজের শরীরে দগ্ধ হয় প্রায় ৭০ শতাংশ অংশ। উদ্ধার করে বার্ণ ইউনিটে ভর্তি করা হলেও, শেষ পর্যন্ত দুজনই পৃথিবীকে বিদায় জানায়।

দুই ভাইবোনের মৃত্যুর খবরে ঢাকা থেকে ভোলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে শোকের ছায়া। এলাকায় শোকস্তব্ধ পরিবেশ, আদরের দুই সন্তানদের হারিয়ে বুকে পৃথিবী সমমান পাথর চাপানো কষ্টে সেন্সলেস হয়ে পড়েন বাবা মা। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলেও আদরের সন্তানদের ডাকতে ডাকতে ফের সেন্সলেস হয়ে পরেন তারা। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন স্বজন, প্রতিবেশীরাও। স্থানীয়দের ভাষায়, “ওরা ছিল খুবই মেধাবী ও ভদ্র। এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”

নাদিয়ার নামাজে জানাজা মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার কামারপাড়া এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়। শেষ বিদায় জানাতে অংশ নেন আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষক, সহপাঠী এবং এলাকাবাসী। নাদিয়ার জানাজা নামাজ শেষে করে পরিবারের সদস্যরা নাফিজকে হাসপাতালে দেখতে গেলে শুনে নাফিজও দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন।

আমি এখন কী নিয়ে বাঁচবো’:

গতকাল (মঙ্গলবার) রাতেও আমার ছেলেকে রক্ত দেওয়া হয়। ডাক্তাররা বলছিল জানাবে। কিন্তু জানিয়েছে ছেলে মারা গেছে…। আমার মেয়েটা একদিন আগে চলে গেলো। এর পরদিন রাতে ছেলেও চলে গেলো। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচবো?’

কথাগুলো বুকে পাথর চেপে বলছিলেন বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত নাজিয়া-নাফির মা। বারবার গলা আটকে আসছিল, হারিয়ে ফেলছিলেন কথা বলার শক্তি। একদিনের ব্যবধানে দুই আদরের ধনকে হারানোর বেদনার কোনো মাপকাঠি হয় না।

১৩ বছর আগে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য আশরাফুল ইসলাম দ¤পতির কোল আলো করে পৃথিবীতে এসেছিল নাজিয়া তাবাসসুম নিঝুম। নিঝুমের জন্মের চার বছর পর কোলজুড়ে আসে ছেলে আরিয়ান আশরাফ নাফি (৯)।

নাজিয়া-নাফির বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল ছেলে-মেয়েকে ভালো স্কুলে পড়িয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানাবেন। ভর্তি করেছিলেন দিয়াবাড়ি কামারপাড়া বাসার কাছাকাছি উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। নাজিয়া ষষ্ঠ শ্রেণিতে আর নাফি পড়তো ইংলিশ ভার্সনে দ্বিতীয় শ্রেণিতে।

যে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে দিনরাত সময় কেটেছে বাবা-মায়ের, আজ তারা নিঃস্ব। পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষ। যেন কেউ নেই তাদের সঙ্গে। শোকে পাথর পুরো পরিবার।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিহত নাজিয়ার নিজেরও ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হবে। সাদা অ্যাপ্রোন পরে বলতো ‘ভয় নেই, আমি আছি।’ সব ভয়কে জয় করে নাজিয়া ও তার ছোট ভাই পাড়ি জমিয়েছে না ফেরার দেশে।

নাজিয়া-নাফির মা ডুকরে ডুকরে কেঁদে বলেন, ‘ঘটনার দিন দুই ছেলেমেয়ে স্কুলে ছিল। আমি ওদের বাসায় নিয়ে যেতে স্কুলে যাই। আমি স্কুলের ওয়েটিং রুমে বসে ছিলাম। ছেলেকে (নাফি) বলছিলাম মেয়েকে (নাজিয়া) আনার জন্য। মাঝে মধ্যে ওর বোনকে রিসিভ করে নিয়ে আসতো।’

ছেলে-মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বিমান এসে বিধ্বস্ত হয়। স্কুল থেকে তাদের নিয়ে আর বাসায় যাওয়া হয়নি। গন্তব্য ছিল হাসপাতাল। সেখানেই সব শেষ।

সোমবার আহত হওয়ার পর নাজিয়া ও তার ভাই নাফিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সেদিনই রাত ৩টার দিকে নাজিয়া মারা যায়। আর মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে থাকে তার ছোট ভাই নাফি। তবে মঙ্গলবার দিনগত রাত ১২টার দিকে নাফিও পাড়ি জমায় না ফেরার দেশে।

জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, ‘উত্তরা বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় দগ্ধ নাজিয়ার শরীরের ৯০ শতাংশ বার্ন হয়েছিল। আর নাফির শরীরের ৯৫ শতাংশ ফ্লেম বার্ন ছিল।’

নাজিয়া-নাফির বাবা-মা নন, পরিবারের অন্য সদস্যরা ভেঙে পড়েন। দুই শিশুর মামা মো. ইমদাদুল হক তালুকদার বলেন, ‘আমাদের মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ। আমার বোন ও দুলাভাই দুজনই ভেঙে পড়েছেন। সবার কাছে দোয়া চাই। মঙ্গলবার নাজিয়ার জানাজা শেষে উত্তরায়ই দাফন করা হয়েছে। আজ নাফির জানাজার পরে বোনের পাশেই তার দাফন স¤পন্ন হবে।’

নিহত নাজিয়া ও নাফির দাদা এ কে এম আলতাফ হোসেন মাস্টার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ওদের বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম নিরবের ইচ্ছা ছিল ছেলেমেয়েকে ভালো স্কুলে পড়িয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানাবে। সে জন্য ১৫-১৬ বছর আগে থেকে ঢাকার উত্তরা দিয়াবাড়ি কামারপাড়া এলাকায় বাসাভাড়া করে বসবাস করছিল। ছেলেমেয়েকে ভর্তি করেছিল কাছাকাছি উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। কিন্তু আজ আমাদের সবার সে স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। নাতি-নাতনিকে হারিয়ে আমরা নিঃস্ব।’

সোমবার (২১ জুলাই) দুপুরে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনে বিধ্বস্ত হয়। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় ২৯ জন নিহত ও আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৬৯ জন।

স্থানীয়রা বলেন, এই দুর্ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বিনোদন বা আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ব্যবস্থায় কতটা নিরাপত্তাহীনতায় ঢাকায় দিন কাটাতে হয় সাধারণ মানুষকে। একটি নি®পাপ পরিবারের দুই সন্তানের এমন মৃত্যুর দায় কে নেবে? নিরাপত্তা নিশ্চিত ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করারও দাবি তুলেন তারা।

বাংলাদেশ সময়: ২১:০৯:৩২   ৩৬৫ বার পঠিত  







পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

জেলা’র আরও খবর


ভোলা জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেলেন আলহাজ্ব গোলাম নবী আলমগীর
ঈদ উদযাপনে ভোলার ঘরমুখো মানুষের ভিড়, প্রস্তুত অর্ধশতাধিক লঞ্চ
ভোলায় জনপ্রিয় হচ্ছে পেঁয়াজ চাষ, ভালো ফলনে কৃষকের মুখে হাঁসি
প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৮ বছরেও পূর্নাঙ্গ রুপ পায়নি ভোলার বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরটি
ভোলা শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও ব্রেন ওয়েভ অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত
ভোলায় ঈদের বাজারে কেনাকাটায় উৎসবের রঙ্গ লেগেছে
ভোলার উন্নয়নে ঐক্য ও সম্প্রীতির সংগঠন ‘আমরা ভোলাবাসী’র ইফতার মাহফিল
ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক সভা ও বর্ণাঢ্য র‌্যালি অনুষ্ঠিত
ভোলা সদর বিএনপির আয়োজনে ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী আলহাজ্ব শহিদুল ইসলামের ইন্তেকাল ॥ শোক



আর্কাইভ