
বিশেষ প্রতিনিধি ॥
‘বাবা পেটটা না থাকলে এতো কষ্ট করতাম না। পেট তো আর বয়স, অসুখ, রোদ-বৃষ্টি বুঝে না। যা-ই হোক তিন বেলা খেতে হলে কাজ করতেই হবে, না হয়ে পেটে খাবার পড়বে না।’
ঘাম মুছতে মুছতে এভাবেই প্রতিবেদকের কাছে নিজের জীবিকার সংগ্রামের কথাগুলো বলছিলেন প্রায় ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ মো. তোফায়েল হাওলাদার। তিনি ভোলার লালমোহন পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের চরছকিনা এলাকার বাসিন্দা।
নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরে বৃদ্ধ তোফায়েল হাওলাদার বলেন, আগে ঢাকায় প্যাডেলের রিকশা চালাতাম। বয়স হওয়ায় শরীর আর এতো কষ্টে সায় দেয় না। যার জন্য তিন বছর আগে এলাকায় এসে ঝাল মুড়ি বিক্রি শুরু করি। পৌরশহরের বিভিন্ন এলাকা ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দ্বারে ছোট্ট একটি ভ্যানে করে এই ঝাল মুড়ি বিক্রি করি। বয়স হয়েছে তাই ভ্যান ঠ্যালে ঘুরতেও অনেক কষ্ট হয়। তবুও প্রতিদিন বের হই। এ ছাড়া যত রোদ আর যতই বৃষ্টি হোক, তবুও এই ঝাল মুড়ি বিক্রি করতে বের হই। কারণ পেট তো আর কষ্ট এবং রোদ-বৃষ্টি বুঝে না।
তিনি বলেন, প্রতিদিন সকাল ৭টায় বাড়ি থেকে বের হয়ে দুপুর ২টায় আবার ফিরে যাই। এরমধ্যে আটশত থেকে এক হাজার টাকার মুড়ি বিক্রি করতে পারি। খরচ বাদে এখান থেকে লাভ হয় চারশ থেকে পাঁচশ টাকার মতো। এই লাভের টাকা দিয়েই বৃদ্ধা স্ত্রীকে নিয়ে সংসার চালাচ্ছি। আমি আর বৃদ্ধা স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে হাপানীতে ভোগছি। এ জন্য প্রতি মাসে দুইজনের অন্তত ৫ হাজার টাকার ওষুধ খেতে হয়। অথচ ভাত খেতেও প্রতি মাসে আমাদের এতো টাকা ব্যয় হয় না।
তিনি আরো বলেন, আমার তিন ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। ছেলেরা বিয়ে করেছে। নিজের সংসার নিয়ে তারা অনেক ব্যস্ত, সংসারের পেছনেও তাদের অনেক খরচ। এতো খরচ সামলানোর পর তারা আর আমি এবং বৃদ্ধা স্ত্রীকে কোনো টাকা দিতে পারে না। এ জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও নেই। তারা স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভালো থাকুক, দোয়া করি তাদের জন্য। এ ছাড়া আমার দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি অনেক আগে। তারা, তাদের শ্বশুর বাড়িতেই থাকে। বাড়িতে আমি আর বৃদ্ধা স্ত্রী থাকি। যে ঘরটাতে থাকি তারও খুব খারাপ অবস্থা ছিল। বৃষ্টি হলেই পানি পড়তো। যার জন্য নিজের কিছু পুঁজি আর ধারদেনা করে অন্তত দেড়লাখ টাকা ব্যয়ে কয়েক মাস আগে ঘরটা মেরামত করেছি। এখন ওই দেনার টাকাও পরিশোধ করতে হবে। এই সামান্য আয়ের টাকা দিয়ে কিভাবে কী করবো, তাই ভেবে ওঠতে পারছি না।
বৃদ্ধ তোফায়েল হাওলাদার বলেন, মানুষ কত ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা পায়। অথচ আমি আর আমার বৃদ্ধা স্ত্রী বয়স্ক ভাতাও পাই না। এই ভাতার জন্য স্থানীয় অনেকের কাছে ঘুরেছি, কারণ উপজেলার কোথায় গেলে এটা হবে তা আমি জানি না। তবে কেউই আমাদের ভাতাটি করে দেয়নি। এ ছাড়া এই বৃদ্ধ বয়সে অসুস্থ শরীর নিয়ে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে জীবিকার জন্য সংগ্রাম করি স্বামী-স্ত্রী দুইজন তিন বেলা খাওয়ার জন্য। তবে অসহায়দের জন্য সরকারি যে চাল বরাদ্দ রয়েছে তাও পাই না। জানি না আর কত অসহায় হলে সরকারি এসব সুযোগ-সুবিধা আমাদের ভাগ্যে জোটবে!
লালমোহন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহ আজিজ জানান, ওই বৃদ্ধের ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।
বাংলাদেশ সময়: ২১:০৬:৩৬ ২৫২ বার পঠিত