
।। এস এম রাজীব হোসাইন ।।
হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট (chokepoint)। এটি মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং তারপর ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। প্রণালীটির এক পাশ ইরান ও অন্য পাশ ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) দ্বারা বেষ্টিত।
???? ১. ভৌগোলিক অবস্থান:
দৈর্ঘ্য: প্রায় ৩৯ কিমি
প্রস্থ: সবচেয়ে সরু অংশে ৩৩ কিমি
একমাত্র সমুদ্রপথ যা দিয়ে পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে তেল পরিবহন হয়।
উল্লিখিত চ্যানেলের দু’পাশেই তেল ট্যাংকার চলাচলের নিরাপদ লেন রয়েছে, যদিও গভীরতা ও নিরাপত্তার কারণে ছোট এবং দ্রুতগতির নৌকা ও মাইন হামলার সুযোগ ইরানের পক্ষের থাকে ।
???? ২. জ্বালানি পরিবহনে গুরুত্ব:
বিশ্বে ব্যবহৃত প্রতিদিনের মোট খনিজ তেলের প্রায় ২০% এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।
সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, ইরান, কাতার, ও UAE—এই সব দেশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির প্রধান রুট এটি।
দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যায়।
???? ৩. আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে প্রভাব:
*তেল ও গ্যাসের দাম নির্ধারণে ভূমিকা:
হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা বা যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়।
উদাহরণ: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সময় তেলের দাম হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
*বাণিজ্য নিরাপত্তা:
বহু দেশ এই রুটের উপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত। এই দেশগুলো হরমুজ প্রণালী হয়ে তেল আমদানি করে।
* সমুদ্র নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি:
ইরান মাঝে মাঝেই হুমকি দেয় যে, যদি তার ওপর আন্তর্জাতিক অবরোধ আরোপ হয় বা সামরিক আক্রমণ হয়, তবে তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে। এটি করলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়বে, কারণ বিকল্প রুট অনেক কম বা ব্যয়বহুল।
???? ৪. সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট (২০২৪-২০২৫):
ইরান-ইসরায়েল এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপোড়েনে হরমুজ প্রণালীতে নৌমহড়া ও সামরিক উত্তেজনা বেড়েছে। এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করে, ফলে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বাড়ে।
কৌশলগতভাবে প্রণালীটির নিকটে ইরানের বিস্তীর্ণ মিলিটারি উপস্থিতি, বিশেষ করে বান্দার আব্বাস, বুশেহর ও চাবাহার জাহাজঘাট থেকে হরতাল বা সম্পূর্ণ অবরোধের সম্ভাবনা থাকে ।
ছোট দ্রুত নৌকা, মাইন, ড্রোন ও উপকূল-ভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্রের সহায়তায় ইরান এভাবে প্রণালী নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে (A2/AD কৌশল) । তবে, সম্পূর্ণ অবরোধ ইরানের জন্যও চাপ সৃষ্টি করবে, কারণ এ দিয়ে নিজের তেল রফতানি বন্ধ হয়ে যায় ।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বাজারে প্রভাব:
সাম্প্রতিক ইসরায়েল-ইরান সংঘর্ষ ও মার্কিন আক্রমণের পর নৌচলাচলে ইলেকট্রনিক হস্তক্ষেপ ও ট্যাঙ্কার জিজ্ঞাসাবাদি বাড়ছে। তেল বাজারে বিনা বাধিত প্রবাহ সত্ত্বেও দামের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে; বিশেষ করে রাজনৈতিক উত্তেজনায় প্রতি ব্যারেল দাম প্রায় $8–31 কিংবা মারাত্মক পরিব্যাপ্ত হলে $100–120 পর্যন্ত ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
যদিও বাজারগুলো এখনও রফতানির বড় বাধা খুঁজে পায়নি, তবুও অস্থির ক্ষমতা বিনিময় ও রাজনৈতিক উদ্বেগ তেলের বিশ্ব বাজারে স্পাইক আনতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও নিরাপত্তা কাঠামো:
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, UAE, অস্ট্রেলিয়া সমেত বহু দেশ “International Maritime Security Construct” (IMSC) নামে সামরিক জোট গঠন করেছেন, যাদের উদ্দেশ্য হরমুজ প্রণালীৰ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা । স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি বন্ধ ঘোষণা হলে আন্তর্জাতিক শক্তি সহজলভ্য বিকল্প পথ হিসাবে আফ্রিকার “East–West Pipeline” ইত্যাদি রুট শক্তিশালী করবে ।
হরমুজ প্রণালী শুধুমাত্র একটি ভৌগোলিক জলপথ নয়, এটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি। এর উপর বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ নির্ভর করে। যে কারণে এটি বিশ্ব রাজনীতি, ভূ-রাজনীতি এবং জ্বালানীনীতির কেন্দ্রে অবস্থিত।
ইরানের হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য অবরোধ আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে সরাসরি ও তীব্র প্রভাব ফেলে। যদিও বর্তমানে সরাসরি অবরোধ হয়নি, তবে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামরিক উত্তেজনায় প্রণালীটির গুরুত্ব নবায়ন পাচ্ছে—যা তেল সরবরাহ, বাজার মূল্য ও বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সুরক্ষা সম্পর্কে মূল চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে। বিশ্ব সম্প্রদায় বিকল্প রুট ও সামরিক ব্যবস্থা দ্বারা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার চেষ্টা করছে।
##
এস এম রাজীব হোসাইন
এম এস এস (মার্ষ্টাস), অর্থনীতি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বাংলাদেশ সময়: ১৩:৫৮:৩৯ ৪৫০ বার পঠিত