ভোলায় সনাতন পদ্ধতির লবণ শিল্পকে জাগিয়ে তুলছে উদ্যোক্তা ইয়াদ

প্রচ্ছদ » অর্থনীতি » ভোলায় সনাতন পদ্ধতির লবণ শিল্পকে জাগিয়ে তুলছে উদ্যোক্তা ইয়াদ
রবিবার, ২২ জুন ২০২৫



---

বিশেষ প্রতিনিধি ॥

দ্বীপজেলা ভোলায় সনাতন পদ্ধতিতে উৎপাদন করা লবণ কারখানাগুলো দিন দিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এক সময়কার জমজমাট লবণ শিল্প এখন মৃত প্রায়। দুইযুগ আগেও জেলায় লবণ উৎপাদনকাারীরা নিজেদের ব্যাক্তিগত পুঁজি খাটিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে লবণ তৈরি করে প্রচুর পরিমাণে লাভের মুখ দেখতেন কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই লাভের দিনগুলো লোকসানের ঘানিতে পরিণত হয়েছে। এর কারণ হিসেবে উদ্যোক্তারা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অনিচ্ছাকে দুষছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা সদর কালীনাথ রায়ের বাজারে সারি সারি অসংখ্য কারখানায় দৈনিক শতশত টন লবণ উৎপাদন হতো। বোরহানউদ্দিন উপজেলার মির্জাকালু বন্দর ছিল এই লবণ বেচাকেনার একমাত্র ট্রানজিট পয়েন্ট। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলা হতে এসে বড়বড় ট্রলার, নৌকা ও জাহাজগুলো লবণ নিতে নোঙর গাড়তো এ বন্দরের ঘাটে। কিন্তু নানাবিধ কারণে সেই রমরমা লবণ ব্যবসা স্থবির হয়ে গেছে। অব্যহত নদী ভাঙ্গনে যেমনি বিলীন হয়ে গেছে, মির্জাকালু লবণ বন্দর তেমনি অধুনালুপ্ত হয়ে গেছে, সনাতন পদ্ধতির উৎপাদিত লবণ শিল্প।

তবুও সময়ের সাথে চ্যালেঞ্জ নিয়ে পূর্বপুরুষের সেই লবণ শিল্পকে ফের জাগিয়ে তোলার প্রয়াস চালাচ্ছেন কিছু উদ্যোক্তা। তাদেরই একজন নব উদ্যমী ৩৬ বছর বয়সী উদ্যোক্তা মো. ইয়াদ হোসেন। লবণ উৎপাদনের সঙ্গে স¤পৃক্ততার কথা বলেন, একসময় ভোলার কালীনাথ রায়ের বাজারের যেই সারিতে ছিল লবণের কারখানার ইঞ্জিনের ঠকঠক শব্দ আর শ্রমিকদের হৈ-হুল্লোড়, এখন সেখানে যেন সুনসান নিরবতা। লবণ উৎপাদনের সেই জৌলুস এখন আর নেই। এমন নিরব-নিস্তব্দতাকে অতীতকালের মতই সরব করতে হাল ধরেছেন-হার না মানা ইয়াদ হোসেন।

সরেজমিন ইয়াদের কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, চলছে লবন পরিশোধনের কাজ, তৈরি হচ্ছে সনাতন পদ্ধতিতে।

কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের মাঝিরঘাট থেকে ট্রলারে বোঝাই করে কাঁচামাল এনে প্রক্রিয়াজাত হয় ভোলা ইয়াদের এই কারখানায়। অপরিশোধিত এই লবণের শোধন হয় জলীয় পদ্ধতিতে। বেশ কয়েকধাপে পরিশোধনের পর পানি মিশ্রিত লবণের দানা শুকানো হয় র্ক্যাশিং মেশিনে। তৈরি হয় বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহার উপযোগী লবণ। পাশাপাশি আয়োডিন মিশ্রিত লবণও তৈরি হয় খাদ্য হিসেবে। পরে প্যাকেটজাত করে বিক্রয় করা হয় আড়তদারদের কাছে। এ লবণের দাম কম হওয়ায় চাহিদাও রয়েছে বেশ। কিন্তু পর্যাপ্ত লোকবল ও আর্থিক প্রণোদনার অভাবে বাড়াতে পাড়ছেনা ব্যবসার পরিধি। তবুও আশাবাদী ইয়াদ।

লবণ তৈরির সার্বিক দিক নিয়ে কথা হয় উদ্যোক্তা ইয়াদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, ভোলা সদরের পৌর কালীনাথ রায়ের বাজারের প্রায় ৩৬ বছর ধরে বাবা’র লবণ উৎপাদনকারী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সাথে স¤পৃক্ত মো. ইয়াদ।

তিনি জানান, পূর্ব পুরুষদের দেয়া এই লবণ ব্যবসাটি চালিয়ে যাচ্ছি। এখানে আরও ২০/২৫টি লবণ কারখানা ছিল। কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশ, অর্থ সংকট আর লোকবলের অভাবে সকলেই এ ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেছেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে মোটা লবণের দাম কম থাকায় চাহিদাও রয়েছে ভোক্তা পর্যায়ে। যেখানে বড় বড় কো¤পানিগুলোর লবণের দাম প্রতি কেজি ৪০/৪২ টাকা সেখানে আমাদের সনাতন পদ্ধতির প্রতি কেজি লবণের দাম মাত্র ১৪ টাকা। তাই ক্রেতা পর্যায়ে এর রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। তাছাড়া এবারের কোরবানি ঈদের পূর্বে শিল্প-মন্ত্রণালয় ভোলার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে আমাদের মিল থেকে ৬০ টন লবণ কিনেছেন।

তিনি আরও বলেন, এ ব্যবসার পরিধি বাড়িয়ে আধুনিক ভ্যাকুয়াম লবণ তৈরির জন্য ভোলা বিসিক শিল্প নগরী থেকে জায়গা বরাদ্ধ নিয়ে ঘর ও কারখানার কাজ শুরু করেছি। অর্থ সংকট থাকায় সেখানে অবকাঠামো তৈরির কাজ আপাতত বন্ধ রয়েছে। তবে সরকারি ঋণ সহায়তা পেলে উৎপাদন বাড়িয়ে ভোলার চাহিদা মিটিয়ে বাহিরেও এ লবণ সরবরাহ সম্ভব হতো।

ইয়াদ জানান, স্বাধীনতার পর ঝালকাঠিতে লবণ শিল্পের বিকাশ ঘটে, তখন কারখানাগুলোতে লবণ তৈরি হতো যাঁতাকল প্রক্রিয়ায়। পরে দেশে আধুনিক ভ্যাকুয়াম পদ্ধতির লবণ কারখানা চালু হলে কমে আসে মিলের সংখ্যা। বর্তমানে আমরা ঝালকাঠি জোনের আওতায় রয়েছি।

এ বিষয়ে ভোলা ক্ষুদ্র শিল্প নগরী (বিসিক) এর জেলা কর্মকর্তা এসএম সোহাগ হোসেন বলেন, ভোলায় লবণের উৎপাদনের কারখানা পূর্বের ন্যায় গতি ফেরাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের প্রস্তাবনা রয়েছে। উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বাড়লে বিসিক শিল্পনগরীতে সরকার লবণ শিল্পে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করবে। এ ক্ষেত্রে লবণ শিল্পের প্রসার ঘটাতে উদ্যোক্তাগণ আবেদন করলে সরকার স্বাগত জানাবে বলেও জানালেন বিসিকের এ কর্মকর্তা।

বাংলাদেশ সময়: ১:০৪:৪৫   ৩৪৫ বার পঠিত  







পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

অর্থনীতি’র আরও খবর


ভোলায় দরিদ্র পরিবারের স্বাবলম্বিতায় মুরগি পালন সহায়তা উপকরণ বিতরণ
ভোলায় ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলমকে অপসারণ ও এ কে এম ফারুকের পুনর্বহালের দাবিতে গ্রাহকদের মানববন্ধন
ভোলায় চামড়ার ভালো দাম পাচ্ছে না মৌসুমী ব্যবসায়ীরা
মনপুরায় আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড়ে লণ্ডভণ্ড ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, প্রায় ১৪ লাখ টাকার ক্ষতি ব্যবসায়ীদের
ভোলার ঐতিহ্যবাহী গজারিয়া পশুর হাট: আড়াইশ বছর ধরে খাজনা ফ্রি বেচাকেনা
জেলা তথ্য অফিস, ভোলা’র আয়োজনে তজুমদ্দিনে কৃষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত
ভোলায় ঈদ ঘিরে জমজমাট পশুর হাট, বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়
চরফ্যাশনে কুরবানির জন্য প্রস্তুত ২৫ হাজার পশু
ভোলার মহিমা এখন ‘লেডি মোবাইল ডাক্তার’ নারীদের প্রথম পছন্দ তিনি!
ভোলার কৃষকের উৎপাদিত পণ্যে জমজমাট কৃষক বাজার



আর্কাইভ