
বিশেষ প্রতিনিধি ॥
ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার মধ্য শম্ভুপুর এলাকার আব্দুল মান্নানের ছেলে মনির। ছোটবেলা থেকে দেখেছেন সংসারের নিদারুণ অভাব-অনটন। তাই তো সেই অভাব দূর করতে ১০ বছর বয়সেই মনির ঢাকায় পাড়ি দেন। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন দিনমজুরের কাজ করেন। এরপর রাজধানীর গুলিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় জুট মালামাল কেনা-বেচা শুরু করেন। তাতে লাভের মুখ দেখেন তিনি। এতে করে ভালোভাবেই চলছিল তাদের সংসার। এরপর ২০১৪ সালে এলাকার প্রতিবেশী রোজিনা আক্তারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় মনিরের। তাদের ১০ বছরের সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামে রেখে রাজধানীতেই জুটের ব্যবসার কারণে থাকতেন মনির। তবে, গত ৫ আগস্টই ছিল তার জীবনের শেষ দিন। ওই দিন ছাত্র-জনতার গণঅভুত্থ্যানে সরকার পতনের খবরে আনন্দ মিছিলে যোগদেন মনির। মিছিলটি রাজধানীর বংশাল থানা সংলগ্ন এসএ পরিবহন কুরিয়ার সার্ভিস অফিসের সামনে পৌঁছালে পুলিশ বাধা দেয়। এতে ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন মনির।
মনিরের স্ত্রী রোজিনা আক্তার জানান, শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে আমার স্বামীও সবার সঙ্গে আনন্দ মিছিলে যান। মিছিল চলাকালে ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সেখানে আমার স্বামীর শরীরে গুলি লাগে। গুলিটা তার পেট ছিদ্র করে বেরিয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন বলে শুনেছি। এরপর ছাত্ররা তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যান। ওইদিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে স্বামীর নম্বর থেকে আমার কাছে ফোন আসে। মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকে অচেনা এক লোক আমাকে জানান মনির গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। পরে আমার শ্বশুর ও আত্মীয়-স্বজন ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে মনিরের লাশ গ্রামে আনেন।
তিনি আরো বলেন, আমাদের সংসারে দুই সন্তান রয়েছে। এর মধ্যে একজনের বয়স ৫ বছর এবং আরেকজনের বয়স ৯ বছর। স্বামীর মৃত্যুতে এখন অসহায় হয়ে পড়েছি। সন্তানদের নিয়ে এখন আমাদের চরম দুঃখ-কষ্টে দিন পার হচ্ছে। তাই আমার স্বামীকে যারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে আমি তাদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবি জানাচ্ছি। একইসঙ্গে আমার ছোট্ট দুই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য সরকারি সহযোগিতা কামনা করছি।
মনিরের বাবা আব্দুল মান্নান বলেন, মনির সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল। কিন্তু আমার সেই ছেলেটাকেই গুলি করে মেরে ফেলেছে। এখন আমার সংসার ও মনিরের দুই সন্তান এবং স্ত্রীর ভবিষ্যতের চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছি। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই এবং মনিরের স্ত্রী-সন্তানদের জন্য সহযোগিতার দাবি করছি।
এ বিষয়ে তজুমদ্দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শুভ দেবনাথ বলেন, ঢাকায় আন্দোলনে নিহত মনিরের পরিবারকে সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠিয়েছি। বরাদ্দ আসলে তা নিহত মনিরের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
প্রসঙ্গত, মনির হত্যার ঘটনায় গত ৪ নভেম্বর তার স্ত্রী রোজিনা আক্তার বাদী হয়ে ঢাকার সিএমএম আদালতে একটি হত্যা মামলা করেছেন। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। ওই মামলায় ৩০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।
বাংলাদেশ সময়: ২:১১:৪৮ ২৫০ বার পঠিত