বোরহানউদ্দিনে মুজিববর্ষের ঘর আর জমি পেয়ে আনন্দে ভাসছে উপকার ভোগীরা

প্রচ্ছদ » জেলা » বোরহানউদ্দিনে মুজিববর্ষের ঘর আর জমি পেয়ে আনন্দে ভাসছে উপকার ভোগীরা
সোমবার, ২০ মার্চ ২০২৩



বোরহানউদ্দিন প্রতিনিধি ॥
ভোলার বোরহানউদ্দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৩তম জন্মদিন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে ভূমিহীন ও গৃহহীন ১০৬ টি পরিবার পাবে মুজিববর্ষের ঘর, ঘর পাওয়ার আকাংখায় খুশিতে দিন গুনছেন গৃহহীন পরিবার গুলো।
চতুর্থ পর্যায়ের ১০৬টি ঘরের মধ্যে ৫৫টি আগামী ২২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করবেন বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নওরীন হক নিশ্চিত করেছেন।

---

জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় কেটেছে ভাসমান অবস্থায়, ছিল না কোনও স্থায়ী ঠিকানা। আবার কারও কারও ঠিকানার অভাবে নিজ দেশেই ছিল নাগরিকত্বের পরিচয়ও। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপহারের আধাপাকা ঘরসহ জমির মালিক হয়ে সবই পাবেন তারা। সেখানেই নতুন করে জীবনের স্বপ্ন বুনবেন একসময়ের গৃহহীন নিুআয়ের মানুষগুলো এ আশা নিয়ে বুক বেঁধেছেন তারা।
এ স¤পর্কে সরজমিনে গিয়ে কথা হয় উপজেলার পক্ষিয়া ইউনিয়নের নদী গর্ভে বসতভিটা বিলীন হয়ে যাওয়া মোঃ দুলালের সঙ্গে ঘর পাবে জেনে মহা খুশি হয়ে তিনি বলেন, আমাদের জন্য এমন সুন্দর ঘর করে দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর জন্য মন থেকে দোয়া করি আল্লাহ যেন তাকে মেলাদিন বাচিঁয়ে রাখে।
শারীরিক প্রতিবন্ধী আব্দুল করিম মিয়া(৬০) বলেন, বাঁচার তাগিদে শরীরে সমস্যা থাকার পরও নিরুপায় হয়ে অন্যের কাছে হাত না পেতে জুতা সেলাই পরে মুদির দোকানের সহকারী হিসেবে কাজ করতে হচ্ছে তাকে।
দু‘মুঠো ভাত আর মাথা গোঁজার ঠাঁই যেন তার নিত্যদিনের সঙ্গী। বর্ষা মৌসুমে খুবই কষ্টে কাটে তার সংসার। ছোট একটি মেয়ে আছে সংসারে।মুজিববর্ষের ঘর পাবে জেনে মহাখুশিতে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানালেন শেখ হাসিনাকে।
কুতুবা ইউনিয়নের কাশেম বেপারীর সঙ্গে সঙ্গে কথা হচ্ছিলো তার নতুন ঘরের বারান্দায়। দিনের বেশিরভাগ সময় সেখানে বসেই কাটান তিনি। মাঝে-মধ্যে আঙিনার খোলা জায়গায় পায়চারী করেন, অপলক তাকিয়ে থাকেন ঘরের দিকে। তার কথায়, ‘সবকিছু এখনও মাঝে-মধ্যে ঘোরের মতো মনে হয়’। নিজের এমন ঘর হবে- কিছুদিন আগেও কল্পনা করেননি তিনি।
শুধু কাশেম ব্যাপারী নন, উপহারের ঘর পাওয়া নি¤œআয়ের সবারই স্বপ্ন ও জীবনযাপনে পরিবর্তন এসেছে। হঠাৎ এমন পরিবর্তনে একদিনে যেমন উচ্ছ্বসিত তারা। অন্যদিকে নতুন করে বাঁচার তাগিদ তাদের মনে। শুধু নিজের ঘর নয়, পুরো প্রকল্প এলাকাই সাজছে তাদের যতœ ও আবেগে। কেউ কেউতো ঘর বুঝে পাওয়ার আগেই চলে এসেছেন নির্মাণাধীন ঘরের তদারকিতে। তাদেরই একজন বৃদ্ধা টগবী ইউনিয়নের আশ্রয়নের রাবেয়া বেগম।
তিনি জানান, ঘর পাওয়ার আগে তিনি চরে কুঁড়েঘরে বাস করতেন। সেই জায়গা নতুন ঘর থেকে প্রায় তিন-চার কিলোমিটার দূরে। ঘর বুঝে পাওয়ার আগে সেখান থেকেই প্রতিদিন ঘরের নির্মাণকাজ দেখভাল করার জন্য হেঁটে চলে আসতেন তিনি। ঘরের দেওয়াল আর মেঝে মজবুত করতে নিজের হাতেই ছিটিয়েছেন পানিও।
উদয়পুর রাস্তা মাথা এলাকার উপকারভোগী ভূমিহীন সফুরা খাতুন (৫০) আজকের পত্রিকাকে বলেন, আমার কুচতা বুদ্ধি কম অউনে আমার দামান অনেক বছর (প্রায় ১৩ বছর) আগে আমারে হালাইয়্যা গেছইনগা। এরহর থেইক্যা মাইনষের বাড়িত ভিক্ষা হইরা কোনক মতে জীবনডা ধইরা রাখছি।
মাইনসের ঘরের বাড়িন্দাত, ইস্কুল ঘরের বাড়িন্দাত রাইত কাডাইছি, অহন আর আমারে মশায় কামরায় না, শেখ হাসিনা আমারে বেল্ডিং ঘর দিছইন? অহন নমাজ হড়ি আর কোরআন হড়ি হেইলার লাগি দোয়া করতাছি। আল্লায় হেইলার বালা করবাইন।
পক্ষিয়া ইউনিয়নের তৃতীয় লিঙ্গের কলি বলেন, সমাজের লোকজন আমাদেরকে ভিন্ন চোখে দেখে। ভিটেমাটি-ঘর বলতে কিছুই ছিল না। ঘর ভাড়া দিতে চায় না। প্রধানমন্ত্রীর উদারতায় এখন মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলাম। মুজিববর্ষের ঘর আর জমি পেয়ে আনন্দে ভাসছে উপকার ভোগীরা।
পক্ষিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন সর্দার বলেন, র্তমানে (৪র্থ পর্যায়ে) ৫২টি ঘরের মধ্যে ৩৭ টি ঘরের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে আরো ১৫ টি চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইউনিয়নটি মেঘনার তীরবর্তী হওয়ায় ভাঙ্গন কবলিত অসহায় মানুষগুলোর স্থায়ী নিবাস হলো।প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি বলেন,আমার ইউনিয়নে নদীভাঙন কবলিত এলাকার লোকজন অনেক বেশি আরো অনেক ঘর প্রয়োজন,ঘর পেলে হয়ত তারা মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে। টগবী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন হাওলাদার,কাচিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রব কাজী প্রধানমন্ত্রীর এ মহতি কাজের জন্য ধন্যবাদ জানান।
বোরহানউদ্দিন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকতা মোঃ সোহেল হোসেন জানান, বোরহানউদ্দিন
উপজেলায় মুজিব বর্ষ উপলক্ষ্যে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১ম পর্যায়ে ২৮, ২য় পর্যায়ে ১৬ টি, ৩য় পর্যায়ে ১৪২টিসহ মোট ১৮৬টি গৃহনির্মান করে হতোপূর্বে ১৮৬টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। উক্ত ১৮৬টি গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে ১ম পর্যায়ে ২৮টি গৃহের মধ্যে ১৪টি কুতুবা ইউনিয়নে এবং ১৪ টি কাচিয়া ইউপিতে,২য় পর্যায়ে ১৬টি গৃহের মধ্যে ১৬ টি কুতুবায় ইউনিয়নের ছাগলা গ্রামে এবং ৩য় পর্যায়ে ১৪২টি গৃহের মধ্যে কুতুবা ৬০টি, কাচিয়া ২১টি, সাচড়া ২১টি এবং টবগীতে ৪০টি নির্মান করা হয়েছে।
৪র্থ পর্যায়ে ১০৬ টি গৃহ নির্মান কাজ চলমান রয়েছে। তার মধ্যে ৫২টি পক্ষিয়া, ১৪টি হাসাননগর, টবগী ৩৬টি কুতুবা ইউপিতে ৪টি নির্মান কাজ চলমান রয়েছে।
এর মধ্যে হাসাননগর ১৪, পক্ষিয়া ৩৭, কুতুবা ৪টিসহ ৫৫টি গৃহ নির্মান কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের অনুকূলে গত ১৫ মার্চ বুধবার কবুলিয়াত দলিল স¤পন্ন করা হয়েছে। ২২ মার্চ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধনের পর বোরহানউদ্দিন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুবিদাভোগীদের মাঝে ঘর গুলো বিতরণ করা হবে বাকি ৫১টি ঘরের কাজ চলমান রয়েছে শেষ হলে সেগুলো ও বিতরণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, খাসজমিতে ব্যারাক নির্মাণের মাধ্যমে ২ শতাংশ খাসজমি বন্দোবস্ত দিয়ে একক গৃহ নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি বাড়িতে থাকবে দুটি শোবার ঘর, একটি রান্নাঘর, একটি টয়লেট ও একটি বারান্দা। এছাড়া প্রতিটি ১০ পরিবারের সুপেয় পানির জন্য একটি গভীর নলকূপের ব্যবস্থা রয়েছে। বৃহৎ এ কর্মযজ্ঞে ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা,তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ও প্রবীণ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বোরহানউদ্দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নওরীন হক ১৮ মার্চ শনিবার সকালে আজকের পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, এদেশের মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্থাপিত হয়েছে মেট্রোরেল।
এতসব কিছুর পাশাপাশি দেশের ভাগ্যহত মানুষকে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়ার যে নজিরবিহীন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার,তা অতুলনীয়,অবিস্মরণীয়।মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই উপহারের কথা ভুলবে না গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবার গুলো যা ইতিহাসের পাতায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখবে।
তিনি জানান, বোরহানউদ্দিনে ঘরের নির্মাণকাজ অত্যন্ত সুন্দরভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের যাচাই বাছাই করে তালিকা তৈরি করা হয়েছে।যাচাই বাছাই ক্ষেত্রে আমরা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান,পৌরসভার মেয়র,সকল ইউপি চেয়ারম্যান,সাংবাদিক, সূধীমহল সকলে মিলে তালিকা তৈরি করেছি।
এই তালিকা অনুযায়ী আগামী ২২ মার্চ ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মাঝে ঘরগুলো বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ সময়: ০:২৫:২২   ৩০৭ বার পঠিত  




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

জেলা’র আরও খবর


রেমালের তান্ডবে লণ্ডভন্ড ভোলা, নিহত ৫ ॥ বিধ্বস্ত সাড়ে ৭ হাজার বসতঘর
ভোলায় জোয়ার-জলোচ্ছ্বাসে ১৩ কিলোমিটার বাঁধের ক্ষতি
চরফ্যাশনের উপকূল বিধ্বস্ত হাজারো ঘরবাড়ি, ডুবেছে ফসল ও মাছের ঘের
ঘূর্ণিঝড় রেমালের তান্ডভে লন্ডভন্ড মনপুরা উপকূল
ভোলায় ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাব কাটেনি অধিকাংশ এলাকা বিদ্যুৎহীন
লালমোহনে ভেসে গেছে কোটি টাকার মাছ
ঘূর্ণিঝড় রিমাল: ভোলায় ২ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, নিহত ৩
ঘূর্ণিঝড় রেমাল: ভোলার উপকূলের অর্ধলাখ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে, নি¤œাঞ্চল প্লাবিত
মনপুরায় নি¤œাঞ্চল জোয়ারে প্লাবিত, আশ্রয়কেন্দ্রে দলবেঁধে ছুটছে মানুষ
চরফ্যাশনে ঝড়ো বাতাসের তীব্রতায় নি¤œাঞ্চল প্লাবিত



আর্কাইভ