ইউপি নির্বাচন: প্রকাশ্যে হুমকি-ধমকি চলছে, নেই আইনি তৎপরতা

বিশেষ প্রতিবেদক ॥

ইউপি নির্বাচনের তিনটি ধাপ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সামনে চতুর্থ ও পঞ্চম ধাপের নির্বাচন হবে। আগামী ২৩ ডিসেম্বর দশম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চতুর্থ ধাপের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী, এদিন দেশের ৮৪০টি ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে ভোট নেওয়া হবে।
নির্বাচনের চতুর্থ ধাপকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য সভায় প্রতিপক্ষকে হুমকি-ধমকি ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে। প্রার্থীদের উসকানিমূলক বক্তব্যের ফোন রেকর্ড বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হতে দেখা যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা থেমে নেই। সূত্র জানায়, পঞ্চম ধাপে আগামী ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ছিল বৃহস্পতিবার। এদিন চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত ৭ প্রার্থীসহ ৫০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। তবে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে আওয়ামী লীগের একাধিক ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। এতে দলীয় প্রার্থীর নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

---

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ৭টি ইউপির নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ৫০ জন, সংরক্ষিত নারী সদস্যপদে ১০৯ জন ও সাধারণ সদস্যপদে ২৭০ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।
সূত্র জানায়, উপজেলার ৭ ইউনিয়নের কয়েকটিতে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত একাধিক প্রার্থী ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ঝিনাইগাতী ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মো. মোফাজ্জল হোসেন, ধানশাইল ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম, কাংশা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মো. আনার উল্ল্যাহ, হাতীবান্ধা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মো. ফসিউর রহমান, সদস্য ইমরান সরকার, রফিকুল ইসলাম ও মো. আসলাম।
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার বিদ্রোহী প্রার্থীদের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত দলীয়ভাবে কোন পদক্ষেপ না নিলেও সূত্র জানায়, নড়াইলের লোহাগড়ায় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় ৯ জনকে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবাস চন্দ্র বোস ও সাধারণ সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিন খানের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বহিষ্কারের বিষয়টি জানানো হয়েছে।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবাস চন্দ্র বোস বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেউ দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হলে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। তাই ওই ৯ প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বহিষ্কৃত নেতারা হলেন লোহাগড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নজরুল শিকদার, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেন, সাবেক অর্থবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ বোরহান উদ্দিন, সাবেক তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক মো. মোস্তফা কামাল ও সাবেক সদস্য মো. শহিদুর রহমান, লাহুড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এস এম কামরুল ও সাধারণ সম্পাদক মো. দাউদ হোসেন, নলদী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদ এবং কাশিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্যসচিব মো. আজিজুর রহমান।
আসন্ন চতুর্থ ও পঞ্চম নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার ঘটনা অবশ্য থেমে নেই। সূত্র জানায়, নির্বাচনী সহিংসতায় কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার পেরিয়া ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামে শাকিল হোসেন (২২) নামের এক তরুণ মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। তিনি পেরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এম এ হামিদের অনুসারী। আগামী ৫ জানুয়ারি এখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
শাকিলের বাড়ি উপজেলার আশারকোটা গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের আবুল খায়েরের ছেলে। তাঁর আবদুল্লাহ নামের এক বছরের একটি ছেলে রয়েছে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে শাকিল সবার ছোট। শাকিল ঢাকায় ফুলকলি বেকারিতে কাজ করতেন। নির্বাচন উপলক্ষে বাড়ি এসে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাত আটটার দিকে মাধবপুর গ্রামে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান এম এ হামিদের নির্বাচনী পথসভা চলছিল। এ সময় আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির মজুমদারের অনুসারী বাবুল গাজী, সোহরাব হোসেন, শাহাব উদ্দিন, অলিউল্লাহ, হুমায়ুন কবির, কাউসার আহমেদ, মনির হোসেন, স্বপন মিয়াসহ অন্তত ৩০ জন লোক দেশি অস্ত্র ও হকিস্টিক নিয়ে পথসভায় হামলা চালান। এতে আশারকোটা গ্রামের শাকিল হোসেন, কাজি জোড় পুকুরিয়া গ্রামের মোহাম্মদ ফরিদ, ফরহাদ হোসেনসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন।
আহত ব্যক্তিদের মধ্যে শাকিলকে প্রথমে নাঙ্গলকোট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে অবস্থার আরও অবনতি হলে গতকাল সন্ধ্যায় তাঁকে প্রথমে রাজধানীর নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে সড়কেই অ্যাম্বুলেন্সে রাত ৯টায় তিনি মারা যান। পরে লাশ রাতেই গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে নাঙ্গলকোট থানায় নিয়ে আসে। শুক্রবার সকালে লাশের ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী। এ ক্ষেত্রে তাঁর ভাষ্য, ‘আওয়ামী লীগের কেউ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অসত্য অভিযোগ করছেন। যতটুকু জেনেছি, তাঁদের নিজেদের কলহে এ ঘটনা ঘটেছে।’
এদিকে, নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার নোয়াখোলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। ওই ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খলিলের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এই আদেশ দেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে আদালতের আদেশের একটি অনুলিপি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।
এর আগে ৫ ডিসেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি মামনুন রহমান ও খোন্দকার দিলীরুজ্জামানের দ্বৈত বেঞ্চ শুনানি শেষে স্থগিতের এ আদেশ দেন।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নোয়াখোলা ইউপি নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ছিল মঙ্গলবার। বৃহস্পতিবার ওই ইউনিয়নে মনোনয়নপত্র বাছাই অনুষ্ঠিত হয়। ১৫ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন।
নোয়াখোলা ইউপির চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খলিল জানান, ২০১৬ সালের নির্বাচনে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার আগের মেয়াদেও তিনি ওই ইউপির চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনের পর ফল বাতিলের আবেদন জানিয়ে হাইকোর্টে রিট করেন ওই নির্বাচনে বিএনপির সমর্থক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মোহাম্মদ শাহজাহান। ফলে আদালতের নির্দেশে ওই চেয়ারম্যান ও সদস্যদের শপথ গ্রহণ স্থগিত থাকে। ২০১৬ সালে করা ওই মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় গত পাঁচ বছর তিনি দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়া হয়নি এবং তাঁরা কোনো সম্মানী ভাতাও পাননি। আগের মেয়াদে চেয়ারম্যান থাকায় তিনি কোনো ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে ধারাবাহিক দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এরইমধ্যে গত ২৭ নভেম্বর নোয়াখোলা ইউনিয়নের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। যার বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন।


এ বিভাগের আরো খবর...
ভোলায় শিশু আইন ২০১৩ বাস্তবায়নে সমন্বয় সভা ভোলায় শিশু আইন ২০১৩ বাস্তবায়নে সমন্বয় সভা
মনপুরায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা সেজে প্রতারণার মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ, প্রতারক আটক মনপুরায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা সেজে প্রতারণার মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ, প্রতারক আটক
শিবপুরে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ কম্বল পেল মুখে মাস্কপড়া দরিদ্ররা শিবপুরে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ কম্বল পেল মুখে মাস্কপড়া দরিদ্ররা
ভোলায় মামলা তুলে নিতে হুমকি ভোলায় মামলা তুলে নিতে হুমকি
চরফ্যাশনে ঘর উত্তোলন করে জমি দখলের অভিযোগ চরফ্যাশনে ঘর উত্তোলন করে জমি দখলের অভিযোগ
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ভোলা পৌরসভায় এ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তর ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ভোলা পৌরসভায় এ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তর
ভারতীয় লাইফ সাপোর্ট এ্যাম্বুলেন্স পেলো ভোলা পৌরসভা ভারতীয় লাইফ সাপোর্ট এ্যাম্বুলেন্স পেলো ভোলা পৌরসভা
ভোলায় ইকরা মাদ্রাসায় পাগড়ি প্রদান করে নতুন ৬ হাফেজকে সম্মাননা ভোলায় ইকরা মাদ্রাসায় পাগড়ি প্রদান করে নতুন ৬ হাফেজকে সম্মাননা
বোরহানউদ্দিনে মানবিক পুলিশ জীবন মাহমুদ বোরহানউদ্দিনে মানবিক পুলিশ জীবন মাহমুদ
জুমায় মসজিদে মসজিদে দোয়ায় এমপি মুকুলের সুস্থতা কামানা জুমায় মসজিদে মসজিদে দোয়ায় এমপি মুকুলের সুস্থতা কামানা

ইউপি নির্বাচন: প্রকাশ্যে হুমকি-ধমকি চলছে, নেই আইনি তৎপরতা
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)